বিশেষ প্রতিবেদকঃ ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগে উচ্চমান হিসাব সহকারী হিসেবে কর্মরত জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে ঘুষ, কমিশন বাণিজ্য, বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ প্রায় দুই দশক একই দপ্তরে কর্মরত থাকার সুযোগে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজের বিল ছাড়, ঠিকাদারি সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং দাপ্তরিক বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে ১৪তম গ্রেডের কর্মচারী। চাকরিজীবনের শুরুতে তার মূল বেতন ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। দীর্ঘ কর্মজীবনে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য বৈধ আয় মিলিয়ে তার উপার্জনের তুলনায় বর্তমানে দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। অনুসন্ধানে তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে জমি, প্লট, ফ্ল্যাট এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে।
কামারখালীতে কোটি টাকার চারতলা বাড়ি
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নসংলগ্ন এলাকায় জাহাঙ্গীর আলমের একটি চারতলা বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বাড়িটির নির্মাণ ও জমিসহ বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কামারখালী ও আশপাশের এলাকায় জাহাঙ্গীর আলম এবং তার স্ত্রীর নামে আরও জমি রয়েছে। এসব জমির পরিমাণ ও ক্রয়মূল্য নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানতে স্থানীয় ভূমি অফিসে যোগাযোগ করা হলেও সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফরিদপুর শহরেও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট
গ্রামের বাড়ির পাশাপাশি ফরিদপুর শহরেও রয়েছে জাহাঙ্গীর আলমের সম্পদ। শহরের ডিআইবি বটতলা সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত ‘বর্ণমালা’ নামে ১০তলা একটি বহুতল ভবনের ৪ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলার ‘৫-সি’ ইউনিটে তার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা বলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের দাবি। ভবনের নিরাপত্তাকর্মীও জানিয়েছেন, জাহাঙ্গীর আলম তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন।
বিল ছাড়ে ৫ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ
গণপূর্ত বিভাগের কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, কাজের বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীর আলমকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হয়। তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে বিলের প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন চাওয়া হয়। এর বাইরে প্রাক্কলন তৈরি, ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন, নতুন লাইসেন্স ইস্যুসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপও রয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, দাবিকৃত অর্থ দিতে কেউ অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ফাইল আটকে রেখে নানা ধরনের হয়রানি করা হয়। দীর্ঘদিন একই দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক দায়িত্বে থাকার কারণে জাহাঙ্গীর আলম দপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাবশালী একটি বলয় তৈরি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, “দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকার কারণে তিনি দপ্তরের অনেক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। তার সঙ্গে সমঝোতা না করে কাজ করা কিংবা বিল ছাড় করানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।”
সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ
জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন ফি, ইজিপি চালুর আগের সময়ের সিডিউল ফি এবং অন্যান্য সরকারি রাজস্বের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব খাতে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে সরাসরি বা বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফল বা আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
২০ বছরের চাকরিতে সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
জাহাঙ্গীর আলমের চাকরির শুরুতে মূল বেতন ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। ওই বেতন ধরে ২০ বছরের মূল বেতন হিসাব করলে তা প্রায় ২৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য বৈধ আয়ের বিষয় বিবেচনায় নিলেও তার দৃশ্যমান সম্পদের সঙ্গে সরকারি চাকরি থেকে অর্জিত আয়ের বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন।
অনুসন্ধানে ফরিদপুরে চারতলা বাড়ি, বহুতল ভবনে ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন এলাকায় জমি ও প্লটের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সম্পদের মোট মূল্য কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি। কেউ কেউ তার মোট সম্পদের পরিমাণ ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত বলে দাবি করলেও এ পরিমাণ সম্পদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি চাকরির বৈধ আয় দিয়ে এত বিপুল সম্পদ কীভাবে গড়ে উঠল এবং এসব সম্পদের অর্থের উৎস কী?
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খায়রুজ্জামান সবুজের সঙ্গেও মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সম্পদের দলিলপত্র, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব এবং সরকারি দাপ্তরিক রেকর্ড যাচাইসহ স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।










