দুদকে অভিযোগ, বদলি-টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন: গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানকে ঘিরে তদন্তের দাবি

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে থাকা মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। তার চাকরিজীবনের পুরোনো বিভাগীয় শাস্তি, পরবর্তী সময়ে দ্রুত পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা অতিক্রম করে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসা, বদলি-পদায়ন, দরপত্র পুনর্মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ—সব মিলিয়ে তার প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চাকরির শুরুর দিকেই ভুয়া শিক্ষাসংক্রান্ত কাগজপত্র ব্যবহারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সরকারি নথি অনুযায়ী, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তার লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয় এবং তিনি দায় স্বীকার করে ক্ষমা চান। পরে তাকে এক বছরের জন্য একটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের শাস্তি দেওয়া হয়।

তবে ওই শাস্তির কয়েক বছর পরই তার ক্যারিয়ারে দ্রুত পরিবর্তন আসে। ২০১৯ সালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে নিয়মিত পদোন্নতি পাওয়ার পর একই বছরের শেষ দিকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হন। এরপর ২০২৫ সালে তাকে প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এখন প্রশ্ন উঠছে—বিভাগীয় মামলায় শাস্তি পাওয়া ওই অতীত রেকর্ড পরবর্তী পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের সময় কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।

জ্যেষ্ঠতার হিসাবেও প্রশ্ন

প্রধান প্রকৌশলীর পদে স্থায়ী নিয়োগের প্রক্রিয়া ঘিরেও প্রশ্ন রয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠতার তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের মধ্যে মো. আবুল খায়ের ও উৎফল কুমার দে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর চেয়ে জ্যেষ্ঠ অবস্থানে রয়েছেন।

অর্থাৎ জ্যেষ্ঠতার বিবেচনায় তিনি শীর্ষে ছিলেন না। এরপরও প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় তার নাম অগ্রাধিকার পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ৬ জুলাই প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগের জন্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের বিবেচনায় পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নাম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রস্তাবিত তালিকায় স্বাভাবিক জ্যেষ্ঠতার ধারাবাহিকতা অনুসরণ করা হয়নি।

তবে শুধু জ্যেষ্ঠতার ক্রমই পদায়নের একমাত্র মানদণ্ড কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরির অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, মূল্যায়ন এবং পদোন্নতি-সংক্রান্ত কমিটির কার্যবিবরণী পর্যালোচনা না করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

২০১৬ সালের বিভাগীয় মামলার নথিতে কী আছে

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত নথি অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য ছুটি ও প্রেষণ নেওয়ার প্রক্রিয়ায় খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ভুয়া অফার লেটারসহ শিক্ষাসংক্রান্ত কাগজপত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।

সরকারি কর্মচারীদের শৃঙ্খলা ও আপিলসংক্রান্ত বিধিমালার আওতায় বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু হয়। তদন্ত শেষে অভিযোগের বিষয়ে তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

নথিতে তার দেওয়া লিখিত জবাবে অভিযোগের দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার তথ্য রয়েছে। পরে ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার স্বাক্ষরিত আদেশে তার একটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়।

এখানেই মূল প্রশ্ন—ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহারের মতো অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর কেন তাকে তুলনামূলকভাবে লঘু শাস্তি দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ওই শাস্তির প্রভাব কী ছিল?

কয়েক বছরের মধ্যেই দ্রুত পদোন্নতি

বিভাগীয় শাস্তির প্রায় তিন বছর পর ২০১৯ সালের ২২ জুলাই খালেকুজ্জামান চৌধুরী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে নিয়মিত পদোন্নতি পান। একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে উন্নীত হন।

অভিযোগকারীদের বক্তব্য, শাস্তির রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও তার পদোন্নতির গতি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত। তবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি কমিটির মূল্যায়ন, সার্ভিস রেকর্ড এবং প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে তার পদোন্নতিকে রাজনৈতিক প্রভাবের ফল হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করার মতো সরাসরি প্রমাণও এখনো পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক পরিচয় ও যোগাযোগ নিয়েও আলোচনা

খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনায় রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগও এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি তৎকালীন প্রভাবশালী নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক বলয়ে যোগাযোগ রাখতেন—এমন দাবি করেছেন অভিযোগকারীদের কেউ কেউ।

তবে সাজেদা চৌধুরীর ছেলে সাজেদ আকবর এমন সম্পর্কের বিষয়ে অবগত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, একই নির্বাচনি এলাকার হওয়ায় বিভিন্ন মানুষ তার মায়ের কাছে আসতেন এবং তাদের কেউ কেউ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ দেখাতে আত্মীয়তার দাবি করতেন।

ফলে খালেকুজ্জামানের সঙ্গে কথিত ওই পারিবারিক সম্পর্ক আদৌ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা পদোন্নতিতে কোনো প্রভাব ফেলেছিল কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।

২০২৪-এর পর নতুন যোগাযোগের অভিযোগ

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার কথিত নতুন রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও অভিযোগ সামনে আসে।

অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এ সময় জামায়াত-ঘনিষ্ঠ একটি পারিবারিক যোগাযোগের পরিচয় তিনি সামনে আনেন। এ ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

খালেকুজ্জামানের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা গ্রামে। একই উপজেলার ফুলসুতি গ্রামে ডা. তাহেরের শ্বশুরবাড়ি। পারিবারিক সূত্রে ডা. তাহেরের স্ত্রী ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরীকে তিনি ‘ফুপু’ বলে সম্বোধন করেন—এমন দাবিও রয়েছে।

তবে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পরিচিতি থাকা এবং তার ভিত্তিতে সরকারি পদ পাওয়া—দুটি বিষয় এক নয়। ২০২৫ সালে প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে এসব যোগাযোগ আদৌ কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা প্রমাণের জন্য নিয়োগ-সংক্রান্ত নথি ও সুপারিশের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

পাঁচ জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে পেছনে ফেলার অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর খালেকুজ্জামান চৌধুরী প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পাওয়ার সময় তার চেয়ে জ্যেষ্ঠ পাঁচজন প্রকৌশলীকে অতিক্রম করেন।

অভিযোগকারীদের একাংশ এ সিদ্ধান্তের পেছনে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের প্রভাব এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেছেন।

তবে কোনো সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সুপারিশ সরাসরি কার্যকর হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তমূলক নথি প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত বিষয়টিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখতে হবে।

পদোন্নতিতে মামলা ব্যবহারের অভিযোগ

জ্যেষ্ঠ কয়েকজন প্রকৌশলীকে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দিতে মামলা ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, রামপুরা থানায় দায়ের করা একটি মামলায় জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীসহ মোট ৪৭ জনকে আসামি করা হয়। পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিবেচনায় মামলার তথ্য ব্যবহার করে কয়েকজন কর্মকর্তার অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে মামলায় আসামি হওয়া কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করে না। আদালতের চূড়ান্ত রায় ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়।

তাই প্রশ্ন হচ্ছে—পদোন্নতি কমিটির কাছে মামলার তথ্য কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং সেটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে বাস্তবে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছিল।

বদলি-পদায়নে বড় সিদ্ধান্ত, পরে প্রত্যাহার

প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর বদলি ও পদায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।

অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, পছন্দের কর্মস্থলে পোস্টিং পেতে আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কোথাও কোথাও ১০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে।

তবে এসব অর্থ লেনদেনের কোনোটি এখনো তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়নি।

চলতি বছরের ৩ মার্চ এক আদেশে একসঙ্গে অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়। এর পর ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে এসব বদলির বড় অংশ বাতিল করা হয়।

স্বল্প সময়ের মধ্যে এত বড় আকারের বদলি এবং পরে তার বড় অংশ প্রত্যাহারের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কেন একসঙ্গে এত কর্মকর্তা বদলি করা হয়েছিল, সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী ছিল এবং পরে বাতিলের কারণ কী—তা জানতে সংশ্লিষ্ট নোটশিট, অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রস্তাব পর্যালোচনা করা জরুরি।

বরখাস্ত প্রকৌশলীকে ঘিরে তারিখের অসঙ্গতি

প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামানকে ঘিরে একটি প্রশাসনিক আদেশের তারিখ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৩ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। ওই আদেশে তাকে লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি আদেশে তাকে ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রিজার্ভে বদলি দেখানো হয়। কিন্তু আদেশটি প্রকাশের তারিখ ছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, বরখাস্তের আগের তারিখ ব্যবহার করে পরবর্তীতে কোনো আদেশ প্রস্তুত বা প্রকাশ করা হয়েছিল কি না।

তবে শুধু প্রকাশের তারিখের পার্থক্য থেকেই নথি জালিয়াতির সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে মূল ফাইল, অনুমোদনের সময়, ডাক রেজিস্টার, ডিজিটাল নথির টাইমস্ট্যাম্প এবং আদেশ জারির ধারাবাহিকতা যাচাই প্রয়োজন।

বড় দরপত্র পুনর্মূল্যায়ন ঘিরে প্রশ্ন

গণপূর্তের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের বড় অঙ্কের দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের ঘটনাও খালেকুজ্জামানকে ঘিরে অভিযোগের তালিকায় এসেছে।

ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, বিভাগ-৩ এবং শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২-এর অধীনে কয়েকটি দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য ফেরত পাঠানোর তথ্য সামনে এসেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসের বিভিন্ন বিধান দেখিয়ে পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর আড়ালে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা থাকতে পারে।

তবে দরপত্র পুনর্মূল্যায়ন নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, পুনর্মূল্যায়নের কারণ, সংশ্লিষ্ট নোটশিট, দরদাতাদের প্রস্তাব এবং শেষ পর্যন্ত কাকে কাজ দেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলেই প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব।

দুদকে লিখিত অভিযোগ

এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগে বদলি-পদায়নে আর্থিক লেনদেন, দরপত্রে অনিয়ম, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিতর্কিত বদলি আদেশের মতো বিষয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগকারীরা সরকারি নথি যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য নেওয়া, আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনা এবং সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন।

তবে কোনো অভিযোগ দুদকে জমা পড়া মানেই সেটি সত্য প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হবে।

সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগও আলোচনায়

খালেকুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় একজন সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।

২০ জুলাই ২০২৬ এক সাংবাদিক মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, সংবাদসংক্রান্ত বিষয়ে যোগাযোগের সময় তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং তার পেশা নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়।

সাধারণ ডায়েরির তথ্য অনুযায়ী, বিষয়টি আইনগতভাবে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, যোগাযোগের রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম বা জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার আগে তার পূর্ববর্তী রেকর্ড যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তার মতে, প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে পদ-পদবি অর্জনের সুযোগ তৈরি হলে যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন ব্যাহত হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে খালেকুজ্জামানের ২০১৬ সালের বিভাগীয় শাস্তির রেকর্ড পরবর্তী পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের সময় কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল—সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

পাওয়া যায়নি খালেকুজ্জামানের বক্তব্য

অভিযোগগুলোর বিষয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্য জানতে ১০ আগস্ট তার দপ্তরে যোগাযোগ করা হয়। তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি।

পরবর্তীতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য, ব্যাখ্যা কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকলে তা প্রতিবেদনের পরবর্তী সংস্করণে যথাযথভাবে যুক্ত করা যেতে পারে।

নথি যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়

খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে ওঠা সব অভিযোগের অবস্থান এক নয়। ২০১৬ সালের বিভাগীয় শাস্তির বিষয়টি সরকারি নথিতে থাকার তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে বদলি-বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব, দরপত্রে সুবিধা দেওয়া কিংবা আর্থিক লেনদেনের মতো অভিযোগগুলোর অনেকগুলো এখনো তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।

তাই অভিযোগ এবং প্রমাণিত ঘটনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা জরুরি।

তবে পুরো বিষয়টি সামনে রেখে কয়েকটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই। বিভাগীয় শাস্তির পর তার দ্রুত পদোন্নতির ক্ষেত্রে অতীত রেকর্ড কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল? জ্যেষ্ঠতার অবস্থান অতিক্রম করে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন যোগ্যতা বা মানদণ্ড প্রাধান্য পেয়েছিল? একদিনে বিপুলসংখ্যক বদলির সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই কেন তার বড় অংশ বাতিল করা হলো? বড় দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক ভিত্তি কী ছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল অভিযোগ বা পাল্টা বক্তব্যে পাওয়া সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন পদোন্নতি ও নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী, নোটশিট, বদলি-পদায়নের প্রস্তাব ও অনুমোদন, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথির পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা।

গণপূর্ত অধিদপ্তর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। ফলে প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে থাকা একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হলে নথি ও তদন্তের মাধ্যমে তা স্পষ্ট হওয়া উচিত। আবার কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায় নির্ধারণ করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই পারে প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করতে।

  • Related Posts

    সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর

    চিত্রনায়ক মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার দুপুরে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটমোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের এ আদেশ…

    ১৬তম গ্রেডের গাড়িচালক ইউসুফের ‘রামরাজত্ব’, গাড়ি-ফ্ল্যাট-জমিসহ বিপুল সম্পদের অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ অভাবের তাড়নায় ঢাকায় এসে একসময় ফুটপাতে পান-সিগারেট বিক্রি করতেন ইউসুফ। ১৯৯৮ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে গাড়িচালক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। বছর তিনেক পর চাকরি চলে যায় রাজস্ব…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    ১১ দলীয় জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী কর্নেল অলির মনোনয়নপত্র দাখিল

    ১১ দলীয় জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী কর্নেল অলির মনোনয়নপত্র দাখিল

    লোডশেডিং ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনার শঙ্কা, প্রশাসনের দ্বারস্থ পল্লী বিদ্যুৎ

    • By admin admon
    • আগস্ট ১৩, ২০২৬
    • 1 views
    লোডশেডিং ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনার শঙ্কা, প্রশাসনের দ্বারস্থ পল্লী বিদ্যুৎ

    এনআইডিতে জন্মতারিখ ও নাম সংশোধনে নতুন নিয়ম

    • By admin admon
    • আগস্ট ১৩, ২০২৬
    • 1 views
    এনআইডিতে জন্মতারিখ ও নাম সংশোধনে নতুন নিয়ম

    কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৬৫, আহত ৩৫০০

    • By admin admon
    • আগস্ট ১৩, ২০২৬
    • 1 views
    কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৬৫, আহত ৩৫০০

    দীর্ঘ ২৩ বছর পর ইরাক থেকে সব সেনা সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

    • By admin admon
    • আগস্ট ১৩, ২০২৬
    • 1 views
    দীর্ঘ ২৩ বছর পর ইরাক থেকে সব সেনা সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

    দুদকে অভিযোগ, বদলি-টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন: গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানকে ঘিরে তদন্তের দাবি

    • By admin admon
    • আগস্ট ১৩, ২০২৬
    • 4 views
    দুদকে অভিযোগ, বদলি-টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন: গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানকে ঘিরে তদন্তের দাবি