মহানবী মুহাম্মদ (সা.) : সব সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ যিনি

image_pdfSaveimage_print

মহানবী মুহাম্মদ (সা.) শুধু সব নবী ও রাসুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নন; বরং গোটা সৃষ্টির মধ্যেও তিনি সর্বাধিক মর্যাদাশীল এবং আল্লাহর কাছে সম্মানিত। এখানে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের কিছু প্রমাণ সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো—

১. সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতস্বরূপ : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’
(সুরা : আল-আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)। মহানবী (সা.) সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, এতে তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়।

২. নাম, সম্মান ও স্মরণে অমর : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আপনার মর্যাদা ও স্মরণকে সমুন্নত করেছি।’ (সুরা : আশ-শরহ/আলাম নাশরাহ লাকা, আয়াত : ৪)। এর একটি প্রকাশ হলো আল্লাহ তাঁর নামকে নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। শাহাদাত, আজান, ইকামত ও তাশাহহুদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতে আল্লাহর নামের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হয়।

৩. আল্লাহ তাআলা নবীজির আনুগত্যকে নিজের আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন : আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাসুলের আনুগত্য করল, সে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহরই আনুগত্য করল।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ৮০)। এবং তাঁর হাতে বায়াতকে আল্লাহ নিজের হাতে বায়াতের সঙ্গে যুক্ত করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আপনার কাছে বায়াত গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহর কাছেই বায়াত গ্রহণ করে।’ (সুরা : আল-ফাতহ, আয়াত : ১০)

৪. স্থায়ী মুজিজা লাভ : পূর্ববর্তী অনেক নবীর মুজিজা ছিল নির্দিষ্ট সময়ে সংঘটিত দৃশ্যমান ঘটনা, যা পরবর্তী সময়ে প্রত্যক্ষভাবে বিদ্যমান থাকেনি। পক্ষান্তরে মহানবী (সা.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ মুজিজা কোরআন আজও বিদ্যমান এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। অতএব, তাঁর মুজিজা এমন একটি স্থায়ী নিদর্শন, যা প্রত্যেক যুগের মানুষ প্রত্যক্ষ করতে পারে এবং যার চ্যালেঞ্জ আজও বহাল রয়েছে।

৫. জিন ও ইনসানের নবী : তিনি সমগ্র মানব ও জিন জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র মানুষের জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ২৮)। পূর্ববর্তী অনেক নবী নির্দিষ্ট জাতি বা সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন। পক্ষান্তরে মুহাম্মদ (সা.) সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর দাওয়াতের ব্যাপ্তি তাই সর্বজনীন।

৬. তাঁর নিয়ে আসা ধর্ম সর্বশ্রেষ্ঠ দ্বীন : ইসলাম পূর্ববর্তী শরিয়তগুলোর বিধানকে পরবর্তী সময়ে রহিত করেছে এবং সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ শরিয়ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে দ্বীন হলো ইসলাম।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯)।  অতএব, যে নবীর মাধ্যমে সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ শরিয়ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাঁর বিশেষ মর্যাদা থাকা স্বাভাবিক।

৭. মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত সর্বোত্তম উম্মত : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের নির্দেশ দাও, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১১০)

এই উম্মত ঈমান, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ এবং আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বানের মাধ্যমে এই মর্যাদা লাভ করেছে। আর এই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব মূলত নবীজির অনুসরণের ফল।

৮. তিনি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানের নেতা হবেন : মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আদম এবং তাঁর পরবর্তী সবাকেই আমার পতাকার অধীনে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৬১৫)

৯. তাঁকে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য প্রদান করা হয়েছে, যা অন্য কাউকে দেওয়া হয়নি : মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য দেওয়া হয়েছে, যা আমার আগে কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ২১৪৭২)

এর মধ্যে তিনি উল্লেখ করেন—তাঁকে সমগ্র মানবজাতির কাছে প্রেরণ করা হয়েছে, সমগ্র পৃথিবীকে তাঁর জন্য মসজিদ ও পবিত্রতার উপায় করা হয়েছে, এক মাসের দূরত্ব থেকেও শত্রুর অন্তরে ভয় সঞ্চার করে তাঁকে সাহায্য করা হয়েছে, তাঁর জন্য গনিমতের সম্পদ হালাল করা হয়েছে, তাঁকে শাফাআত প্রদান করা হয়েছে, যা তিনি তাঁর উম্মতের জন্য সংরক্ষণ করেছেন। এগুলো তাঁর বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের সুস্পষ্ট নিদর্শন।

১০. তিনি সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা : আল-কলম, আয়াত : ৪)

১১. তিনি নবুয়ত ভবনের শেষ ও পূর্ণ ইট : সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমার এবং আমার পূর্ববর্তী নবীদের দৃষ্টান্ত এমন এক ব্যক্তির মতো, যে একটি সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ ভবন নির্মাণ করেছে; কিন্তু তার এক কোণে একটি ইটের স্থান খালি রয়েছে। মানুষ ভবনটি দেখে বিস্মিত হয় এবং বলে—এই একটি ইট এখানে বসানো হলো না কেন? আমি সেই ইট।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৫৩৫)

১২. মেরাজের রাতে তিনি সব নবীর ইমামতি করেন : মেরাজের রাতে মহানবী (সা.) বাইতুল মুকাদ্দাসে সমবেত নবীদের ইমামতি করেন। সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি সেখানে মুসা (আ.), ঈসা (আ.) ও ইবরাহিম (আ.)-সহ অন্যান্য নবীকে দেখতে পান এবং নামাজের সময় তাঁদের ইমামতি করেন। এ ঘটনা তাঁর বিশেষ মর্যাদা ও নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

১৩. কিয়ামতের দিন তিনি সর্বপ্রথম শাফাআতকারী ও সর্বপ্রথম সুপারিশকৃত : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আমি আদম সন্তানের নেতা। আমিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যার জন্য কবর বিদীর্ণ হবে; আমিই সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং সর্বপ্রথম যার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।’

(তিরমিজি, হাদিস : ৩১৪৮)। এটি তাঁর কিয়ামতের দিনের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও নেতৃত্বের অত্যন্ত স্পষ্ট প্রমাণ।

১৪. ইসরা ও মেরাজের মুজিজা : মহানবী (সা.)-এর ইসরা ও মেরাজ তাঁর বিশেষ মর্যাদার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এই ঘটনায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে এমন বহু বিশেষ সম্মান ও নিদর্শন দান করেছেন, যা অন্য কোনো নবীর ক্ষেত্রে এভাবে একত্রিত হয়নি। ইসরা ও মেরাজের ঘটনায় তাঁকে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আসমানসমূহ অতিক্রম করেন, বহু নবীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়, তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে নবীদের ইমামতি করেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য সালাতের বিধান লাভ করেন। এ ঘটনা তাঁর বিশেষ মর্যাদা ও আল্লাহর নৈকট্যের একটি অনন্য নিদর্শন।

১৫. তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করাকে ইবাদত ও নৈকট্যের মাধ্যম করা হয়েছে : এটি তাঁর বিশেষ মর্যাদার এক অসাধারণ নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করো।’ (সুরা : আল-আহজাব, আয়াত : ৫৬)। অর্থাৎ আল্লাহ নিজে তাঁর ওপর রহমত ও সম্মান বর্ষণ করেন, ফেরেশতারাও তাঁর জন্য দোয়া করেন এবং মুমিনদেরও তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

১৬. সব নবী-রাসুলের কাছ থেকে তাঁর প্রতি ঈমান ও সাহায্যের অঙ্গীকার গ্রহণ : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর স্মরণ করুন, যখন আল্লাহ নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন—আমি তোমাদের কিতাব ও হিকমত যা কিছু দিয়েছি, অতঃপর তোমাদের কাছে এমন একজন রাসুল আসেন, যিনি তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়ন করেন, তখন অবশ্যই তোমরা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৮১)

এই আয়াত মহানবী (সা.)-এর বিশেষ মর্যাদার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কারণ পূর্ববর্তী নবীদের কাছ থেকে তাঁর আগমন সত্য বলে স্বীকার করা এবং তাঁকে সাহায্য করার অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মহানবী (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্বের আরো বহু প্রমাণ আছে।

  • Related Posts

    আলেয়া মান্নানের অপ্রকাশিত লিখা ‘কাল যদি’- কবিতা

    কাল যদি          -আলেয়া মান্নান   ভাবতে গিয়ে তোকে নিয়ে, বন্ধ হয় নিঃশ্বাস। কাল যদি তুই আবার, আমায় ভুলে যাস। তোকে নিয়েই ভয় যত, আছি আমি ভয়ে।…

    সাংবাদিকদের অধিকার ও কল্যাণে কাজের প্রত্যয়, আন্তর্জাতিক প্রেসক্লাব ট্রাস্টের উপদেষ্টা খান সেলিম রহমান

    নিজস্ব প্রতিবেদকঃ আন্তর্জাতিক প্রেসক্লাব ট্রাস্টের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে মনোনীত হয়েছেন বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেসক্লাব কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও জাতীয় দৈনিক মাতৃজগত পত্রিকার সম্পাদক খান সেলিম রহমান। এ সম্মানজনক দায়িত্বে মনোনীত…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    মহানবী মুহাম্মদ (সা.) : সব সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ যিনি

    মহানবী মুহাম্মদ (সা.) : সব সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ যিনি

    আলেয়া মান্নানের অপ্রকাশিত লিখা ‘কাল যদি’- কবিতা

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৬, ২০২৬
    • 6 views
    আলেয়া মান্নানের অপ্রকাশিত লিখা ‘কাল যদি’- কবিতা

    প্রতিবাদ উপেক্ষা করে সুনামগঞ্জে ৪ হাজার ৮৮৪ গাছ কাটার অভিযোগ

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৬, ২০২৬
    • 4 views
    প্রতিবাদ উপেক্ষা করে সুনামগঞ্জে ৪ হাজার ৮৮৪ গাছ কাটার অভিযোগ

    বিশ্বজুড়ে ভিসা ইন্টারভিউ কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র

    বিশ্বজুড়ে ভিসা ইন্টারভিউ কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র

    ভুটানের রাজার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সৌজন্য সাক্ষাৎ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে ভুটান সফরের আমন্ত্রণ

    ভুটানের রাজার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সৌজন্য সাক্ষাৎ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে ভুটান সফরের আমন্ত্রণ

    নভেম্বরে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি, শুরুতে ইউপি নির্বাচন

    • By Sara
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 12 views
    নভেম্বরে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি, শুরুতে ইউপি নির্বাচন