বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার কিসমত-জাফরাবাদ এলাকায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প। প্রায় ১১ বছর আগে শুরু হওয়া এই প্রকল্প এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ আটকে থাকা, মাটি ভরাটের কাজে অনিয়ম, সরকারি অর্থের অপব্যবহার এবং প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন প্লটের জন্য টাকা দেওয়া ১১৫টি পরিবার। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তারা এখনো নিজেদের প্লট বুঝে পাননি।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মিরসরাইয়ের কিসমত-জাফরাবাদ মৌজায় ১৬ দশমিক ২৮ একর জমিতে এই প্রকল্প নেওয়া হয়। শুরুতে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪২ কোটি ৩৭ লাখ ২১ হাজার টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ভূমি উন্নয়ন ও অন্যান্য কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ হয়নি। সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্যেও প্রকল্পটি পরবর্তী বছরগুলোতে চলমান হিসেবে দেখা গেছে।
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে মাটি ভরাটের কাজ নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্প এলাকায় যে পরিমাণ মাটি ভরাট দেখিয়ে বিল করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কম মাটি ভরাট করা হয়। দুদকের মামলার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে ৮৭ হাজার ৯৩ দশমিক ১৬০ ঘনমিটার মাটি ভরাট দেখানো হয়েছিল। প্রতি ঘনমিটার মাটির দর ধরা হয়েছিল ২২৯ টাকা ২৫ পয়সা। কাজ শেষে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকার বিল দাবি করে। বিভিন্ন কর্তন বাদ দিয়ে ঠিকাদারকে ১ কোটি ৩৭ লাখ ৭৬ হাজার ৬১৪ টাকা পরিশোধ করা হয়। পরে সরেজমিন পরিমাপে প্রকৃত মাটি ভরাট পাওয়া যায় ৪৩ হাজার ১২৯ দশমিক ৬২৮ ঘনমিটার। অর্থাৎ কাগজে দেখানো কাজের তুলনায় বাস্তবে প্রায় অর্ধেক মাটি ভরাটের প্রমাণ পাওয়া যায়।
দুদকের হিসাব অনুযায়ী, প্রকৃত কাজের পরিমাণ বিবেচনায় বিল হওয়ার কথা ছিল প্রায় ৯৮ লাখ ৮৭ হাজার ৪৬৭ টাকা। কিন্তু পরিশোধ করা হয় ১ কোটি ৩৭ লাখ ৭৬ হাজার ৬১৪ টাকা। এতে ৪৮ লাখ ৭৭ হাজার ৮৯৪ টাকা সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনায় ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মামলা করা হয়। মামলায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদ, তৎকালীন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. অলিউল ইসলাম, উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পার্টনার ইনচার্জ মাঈনুল কবিরকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে চলমান।
তবে প্রকল্পের মাটি ভরাটের অনিয়ম নিয়ে এর আগেও প্রশ্ন উঠেছিল। পূর্ববর্তী তদন্তে প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকা বিল দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। সে সময় প্রকৃত মাটি ভরাটের পরিমাণও নথিতে দেখানো পরিমাণের তুলনায় কম পাওয়া যায়। ফলে শুরু থেকেই প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন কাজের হিসাব ও বাস্তব কাজের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ সামনে আসে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও পরবর্তীতে ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট নথির বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রকল্পের মূল ব্যয়ের পাশাপাশি সংশোধিত উন্নয়ন প্রস্তাবে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আগের কাজের অনিয়মের বিষয়গুলো যথাযথভাবে নিষ্পত্তি না করেই নতুন করে একই ধরনের কাজের জন্য অর্থ বরাদ্দের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে আগের বিলের অর্থ আদায় বা দায় নির্ধারণের আগে একই স্থানে আবার মাটি ভরাটের ব্যয় যুক্ত হলে সরকারের একই কাজে দ্বৈত ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার কারণে শুধু সরকারি অর্থের বিষয়ই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্লট গ্রহীতারাও। প্রকল্পের ১১৫টি পরিবারের অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরে টাকা পরিশোধ করেও প্লট বুঝে পাচ্ছেন না। এর মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে প্লটের মূল্যও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার পাশাপাশি বাড়তি আর্থিক চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন বরাদ্দপ্রাপ্তরা।
প্রকল্পের অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে নাম এসেছে কাওসার মোর্শেদ, মো. অলিউল ইসলাম ও মো. আশরাফুজ্জামানের। এর মধ্যে কাওসার মোর্শেদ সে সময় প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন। মো. অলিউল ইসলাম ছিলেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং মো. আশরাফুজ্জামান ছিলেন উপসহকারী প্রকৌশলী। পরবর্তী সময়ে তাদের দায়িত্ব ও পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মামলার আসামি হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একজনকে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত দায় বা অপরাধ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অনিয়মের তদন্ত ও মামলা চলার মধ্যেই প্রকল্পের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। এ কারণে প্রকল্পের আগের অনিয়মের নিষ্পত্তি না করে নতুন করে কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রকল্পটি আবারও আলোচনায় এসেছে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় থেকে গত ২৬ আগস্ট চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও প্রশাসন) আজিজ হায়দার ভূঁইয়াকে। এর আগে দুদকের মামলাও চলমান রয়েছে। ফলে নতুন তদন্তে প্রকল্পের শুরু থেকে বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত ব্যয়, মাটি ভরাটের পরিমাণ, ঠিকাদারকে দেওয়া বিল, কর্মকর্তাদের দায়িত্ব এবং পরবর্তী সময়ে ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত—সবকিছু যাচাই করা হতে পারে।
দুদকের তদন্তের মধ্যেই প্রকল্পের বাকি কাজ কীভাবে শুরু করা হবে, তা নিয়েও চিঠিপত্র হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মো. অলিউল ইসলামের দায়িত্বকালীন সময়ে প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজ শুরু করার বিষয়ে দুদকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এ নিয়ে প্রকল্প পরিচালকের স্মারক নং-২০১, তারিখ ১৮ আগস্ট ২০২৬ এবং দুদকের স্মারক নং-২৩৬২, তারিখ ২৫ আগস্ট ২০২৬-এর বিষয়ও সামনে এসেছে। তবে তদন্ত চলমান থাকায় এসব যোগাযোগের উদ্দেশ্য এবং এর প্রশাসনিক প্রভাবও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের বিষয়।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের উন্নয়ন কর্মসূচিতে কিসমত-জাফরাবাদ প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দের তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকা প্রকল্পটি নতুন করে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, নতুন উন্নয়নকাজের আওতায় প্রায় ১৮ কোটি টাকার কাজ নেওয়ার উদ্যোগ হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ দ্রুত কাজ শেষ করে প্লট গ্রহীতাদের বুঝিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগমের কাছে প্রকল্পটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্পটি সম্পর্কে তার আগে জানা ছিল না। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন এবং অনিয়মের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
সব মিলিয়ে কিসমত-জাফরাবাদ আবাসন প্রকল্পের মূল প্রশ্ন এখন তিনটি—কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হলো না কেন, মাটি ভরাটের কাজে সরকারি অর্থের হিসাব নিয়ে এত অভিযোগ উঠল কেন এবং অনিয়মের অভিযোগ নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই প্রকল্পের ব্যয় ও কাজের পরিধি কেন বাড়ানো হলো। এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে চলমান দুদকের মামলা, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নতুন তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের ওপর। আর এই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় থাকছেন সেই ১১৫ পরিবার, যারা বহু বছর ধরে নিজেদের একটি স্থায়ী ঠিকানার অপেক্ষায় রয়েছেন।











