জিনপিং-ট্রাম্পের বৈঠকে কি কি ঘটতে পারে?

image_pdfSaveimage_print

আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থায়িত্ব নির্ধারণে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে। বৈশ্বিক বাণিজ্য সংঘাত, দ্রুত বিকাশমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর নিয়ন্ত্রণ, তাইওয়ান প্রণালির উত্তাপ, রাশিয়ার ওপর নতুন আমেরিকান নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকা ভয়াবহ সংকটের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি হচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এড়িয়ে ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর শি জিনপিংয়ের এই ঐতিহাসিক ওয়াশিংটন সফর বিশ্বরাজনীতিতে দুই পরাশক্তির সম্পর্ক স্থিতিশীল করার এক বড় পরীক্ষা। চলতি বছরে মে মাসে বেইজিংয়ে দুই নেতার বৈঠকের পর ২৪ সেপ্টেম্বরের এই শীর্ষ বৈঠককে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি থেকে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্থিতিশীলতা গড়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বৈঠকের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুই দেশের সম্ভাব্য শুল্ক যুদ্ধ থামানো এবং বাণিজ্যিক স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনা। আগামী ১০ নভেম্বর দুদেশের বর্তমান বাণিজ্য ট্রুথ বা সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। এর আগেই অবশ্য ওয়াশিংটনে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেংয়ের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে একে অপরের কাছ থেকে আমদানি করা প্রায় ৩ হাজার কোটি (৩০ বিলিয়ন) ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর শুল্ক ছাঁটাই বা শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। একইসঙ্গে মার্কিন শিল্পখাতে চীনের সুনিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি ও সংকটময় খনিজ সম্পদ সরবরাহ সচল রাখার বিষয়টিও আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের জন্য এই বৈঠক অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের বড় সুযোগ, অন্যদিকে বেইজিং এটিকে নিজেদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যম হিসেবে দেখছে।

আধুনিক প্রযুক্তির দৌড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতার প্রধান ময়দান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অ্যাডভান্সড চিপস, প্রসেসিং ক্ষমতা ও ফ্রন্টিয়ার মডেল নিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও দুটি দেশই চাইছে প্রযুক্তিগত এই প্রতিযোগিতা যেন কোনো অনিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তাহীনতায় রূপ না নেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব এখন প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে যেখানে সম্পূর্ণ ঐকমত্য সম্ভব নয়, তবে একটি নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক বা গাইডলাইন তৈরি করা জরুরি। দুই পরাশক্তিই একটি সুরক্ষাবলয়সহ প্রতিযোগিতার নীতি মেনে চলতে সম্মত হতে পারে। অর্থাৎ চিপ বা এআই উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতা চলবে, তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সুরক্ষায় কিছু নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা মেনে চলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন ট্রাম্প ও শি।

তবে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্প্রতি গৃহীত রুশ নিষেধাজ্ঞা আইন ট্রাম্প-শি আলোচনার টেবিলে একটি নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত ওই আইনে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে, তিনি ইচ্ছা করলে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ক্রয়কারী দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারেন। এতে চীন ও ভারতের মতো বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্প যদি চীনের ওপর এই ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপান, তবে তা বর্তমান মার্কিন-চীন বাণিজ্য সমঝোতাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেবে এবং এর জবাবে চীনও বিরল খনিজ উপাদান (রেয়ার আর্থ) রপ্তানি বন্ধের মতো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে। সেই ঝুঁকিতে না গিয়ে ট্রাম্প হয়তো তার বিশেষ ছাড় বা মওকুফ ক্ষমতা ব্যবহার করবেন, যাতে করে রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখার পাশাপাশি চীনের সাথে বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়।

এদিকে বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং লোহিত সাগরের অস্থিরতা। বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকায় হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় জ্বালানি এবং বাণিজ্য পরিবহন ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে। জ্বালানি আমদানির ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় চীনের স্বার্থও এখানে সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত। রিয়াদ ও তেহরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো থাকায় চীন ইতোমধ্যে ইরানের মাধ্যমে হুতিদের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হোয়াইট হাউস চীনা প্রেসিডেন্টের এই প্রভাবকে কীভাবে কাজে লাগায়, সেটি এখন এক বড় প্রশ্ন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং হয়তো মার্কিন কূটনীতির সরাসরি কোনো প্রতিনিধি বা মধ্যস্থতাকারী হবে না কিন্তু বাণিজ্যিক পথ খোলা রাখতে একটি বিকল্প ‘ডিপ্লোম্যাটিক ব্রিজ’ বা কূটনৈতিক সেতু হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

যে বিষয়টিতে দুটি দেশের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ সবচেয়ে কম, তা হলো তাইওয়ান ইস্যু। বেইজিং স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাইওয়ানই তাদের জাতীয় স্বার্থের মূল কেন্দ্রবিন্দু এবং এ নিয়ে কোনো আপস হতে পারে না। যদিও ট্রাম্প অতীতে বহুদূরের যুদ্ধ ও তাইওয়ান স্বাধীনতায় সরাসরি সেনা না পাঠানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবুও ওয়াশিংটনের মূল কৌশলগত অবস্থান ও তাইওয়ানের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়। তাই এই সংবেদনশীল বিষয়ে ট্রাম্পের শব্দচয়ন বা বক্তব্য কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে চরম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বাস্তবতা হলো, ওয়াশিংটনের এই রাষ্ট্রীয় সফর বিশ্বরাজনীতি বা মার্কিন-চীন মধ্যকার মতাদর্শগত ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে এক নিমেষে বদলে দেবে না। দুই পক্ষই জানে, পূর্ণাঙ্গ বন্ধুত্ব অসম্ভব; তাই মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন একটি কাঠামোগত পদ্ধতি তৈরি করা যেন প্রতিযোগিতা বাড়লেও তা কোনো অবস্থাতেই প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত বা হঠাৎ অর্থনৈতিক ধসে রূপ না নেয়। ওয়াশিংটন ও বেইজিং কি কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে এই দীর্ঘমেয়াদী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিয়ন্ত্রিত সীমানার মধ্যে রাখতে পারবে, নাকি শেষ পর্যন্ত নতুন সংকটে জড়িয়ে পড়বে; সারা বিশ্ব এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।

সূত্র: টিআরটি

  • Related Posts

    বিশ্ববাজারে আরও কমলো জ্বালানি তেলের দাম

    আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন পুনরায় চালু হওয়ায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধিতে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও কমেছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) টানা ষষ্ঠ সেশনের মতো…

    জামায়াতে ইসলামীকে ইসলামাবাদমুখী লংমার্চ স্থগিতের অনুরোধ শেহবাজের

    আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ জামায়াতে ইসলামীর ইসলামাবাদমুখী লংমার্চ স্থগিত রাখার অনুরোধ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। পেট্রোলিয়াম লেভির বিরুদ্ধে চলমান এই মার্চ নিয়ে জামায়াতের আমির হাফিজ নাঈমুর রহমানকে ফোন করে তিনি এ…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    বাংলাদেশের ই-কমার্স সম্প্রসারণে ঢাকায় অফিস খুলতে আগ্রহী মেটা

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
    • 2 views
    বাংলাদেশের ই-কমার্স সম্প্রসারণে ঢাকায় অফিস খুলতে আগ্রহী মেটা

    জিনপিং-ট্রাম্পের বৈঠকে কি কি ঘটতে পারে?

    জিনপিং-ট্রাম্পের বৈঠকে কি কি ঘটতে পারে?

    আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা অব্যাহত রাখার তাগিদ রাষ্ট্রপতির

    আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা অব্যাহত রাখার তাগিদ রাষ্ট্রপতির

    ওবায়দুল কাদেরদের রায় নিয়ে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ মন্তব্য: দুই আইনজীবীর শুনানি পেছালো

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
    • 8 views
    ওবায়দুল কাদেরদের রায় নিয়ে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ মন্তব্য: দুই আইনজীবীর শুনানি পেছালো

    ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের রায় নিয়ে মন্তব্য: দুই আইনজীবীর শুনানি ২৬ অক্টোবর

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
    • 5 views
    ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের রায় নিয়ে মন্তব্য: দুই আইনজীবীর শুনানি ২৬ অক্টোবর

    দুদকের মামলা, অবৈধ সম্পদের অভিযোগ ও গ্রেফতারি পরোয়ানা—তারপরও পাবনায় নিয়মিত অফিস করছেন আলতাব হোসেন

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
    • 24 views
    দুদকের মামলা, অবৈধ সম্পদের অভিযোগ ও গ্রেফতারি পরোয়ানা—তারপরও পাবনায় নিয়মিত অফিস করছেন আলতাব হোসেন