বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় সরকারি জমি দখলে রাখা এবং ভাড়া বাবদ বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও বর্তমানে বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক চৌধুরীসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ঘটনায় আগ্রাবাদ কনভেনশন হলের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফাহিম আহমেদও আসামি হচ্ছেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার, জাল কাগজপত্র তৈরি ও ব্যবহার, সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখলে রাখা এবং বকেয়া ভাড়া পরিশোধ না করে সরকারি অর্থের ক্ষতি করার অভিযোগে মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে আত্মসাতের পরিমাণ ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৬৮ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তারা পরস্পরের যোগসাজশে নিজেদের আর্থিকভাবে লাভবান করার পাশাপাশি অন্যদেরও সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সরকারি সম্পত্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি ও রেকর্ডে জালিয়াতির আশ্রয় নেন। এসব নথি ব্যবহার করে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার প্রায় ২৪ দশমিক ৯৬ শতক সরকারি জমি দখলে রাখা হয় বলে দুদকের অভিযোগ।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি জমি ব্যবহারের বিপরীতে যে ভাড়া বা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা ছিল, তা যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়নি। এর ফলে দীর্ঘ সময়ের বকেয়া ভাড়া, সরকারি সম্পত্তির আর্থিক ক্ষতি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট হিসাব মিলিয়ে সরকারের মোট ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৬৮ টাকা ক্ষতি বা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার অন্যতম আসামি মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক চৌধুরী গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রায় পাঁচ বছর তিনি ওই পদে ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার দেখভালের দায়িত্বও তার অধীনে ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বর্তমানে তিনি বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে থাকার কথা থাকলেও গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর দাবি, তিনি এক বছরের বেশি সময় ধরে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি কানাডায় অবস্থান করছেন বলেও সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি রয়েছে। তবে বিদেশে অবস্থানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এই প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
দুদকের অভিযোগে শুধু সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টিই নয়, নথি জালিয়াতির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা সরকারি জমি ও তার ব্যবহার সংক্রান্ত প্রকৃত তথ্য আড়াল করতে ভুয়া রেকর্ডপত্র তৈরি ও ব্যবহার করেন। এসব নথির মাধ্যমে জমিটি অবৈধভাবে দখলে রাখার সুযোগ তৈরি করা হয় এবং সরকারি পাওনা আদায় বাধাগ্রস্ত করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সরকারি সম্পত্তির মালিকানা ও ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য বিকৃত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করছে দুদক। একই সঙ্গে সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও মামলার তদন্তে গুরুত্ব পাবে।
দুদকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা করা হবে। এসব ধারার মধ্যে সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির মাধ্যমে বিশ্বাসভঙ্গ ও অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা, মূল্যবান দলিল জাল করা, জাল দলিলকে আসল হিসেবে ব্যবহার এবং অপরাধে সহযোগিতা বা যোগসাজশের মতো অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এখানে ৪০৯ ধারার অভিযোগ মূলত সরকারি দায়িত্ব বা বিশ্বাসের অবস্থান ব্যবহার করে সম্পদ বা অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ৪২০ ধারায় প্রতারণার বিষয়টি আসে। অন্যদিকে ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ দলিল জাল করা এবং প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। ৪৭১ ধারায় জাল দলিলকে আসল হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়টি এবং ১০৯ ধারায় অপরাধে সহযোগিতা বা প্ররোচনার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়।
অভিযোগের মূল কেন্দ্র আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার ২৪ দশমিক ৯৬ শতক সরকারি জমি। দুদকের দাবি, ওই জমি অবৈধভাবে দখলে রাখার পাশাপাশি নির্ধারিত ভাড়া বা সরকারি পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। পরবর্তীতে জাল ও ভুয়া নথির মাধ্যমে দখল ও ব্যবহারকে বৈধ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
দুদকের মামলার অনুমোদনের পর এখন তদন্তের মাধ্যমে এসব অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা হবে। জমিটির প্রকৃত মালিকানা, কীভাবে দখল নেওয়া হয়েছিল, কোন সময় থেকে সরকারি ভাড়া বকেয়া ছিল, কারা নথি তৈরি বা অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সরকারি কর্মকর্তার ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে—এসব বিষয় তদন্তে উঠে আসতে পারে।
একই সঙ্গে ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৬৮ টাকা কীভাবে হিসাব করা হয়েছে এবং এই অর্থের সঙ্গে আসামিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা কতটুকু, সেটিও তদন্তের বিষয় হবে। সরকারি নথি, জমির রেকর্ড, ভাড়া সংক্রান্ত হিসাব, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ফাইল এবং অন্যান্য আর্থিক কাগজপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে অর্থের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
মামলার অনুমোদনের বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক চৌধুরীর কর্মস্থলে অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন এবং দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনুমোদন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল কি না, সেটিও আলাদাভাবে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তবে মামলার অনুমোদন মানেই অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। দুদকের তদন্ত, মামলা এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই হবে। আসামিরাও আদালতে নিজেদের বক্তব্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন।
এখন দুদকের তদন্তে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পাবে—সরকারি ২৪ দশমিক ৯৬ শতক জমি কীভাবে দখলে রাখা হয়েছিল, জমির বিপরীতে সরকারি পাওনা কেন পরিশোধ করা হয়নি এবং জাল নথি তৈরির সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক চৌধুরী তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কি না, সেটিও তদন্তে নির্ধারণ করা হবে।
সব মিলিয়ে, আগ্রাবাদ কনভেনশন হলকে ঘিরে সরকারি জমি ব্যবহার, ভাড়া বকেয়া এবং নথি জালিয়াতির অভিযোগ এখন দুদকের মামলার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক তদন্তের পর্যায়ে যাচ্ছে। ২৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকার বেশি অর্থের এই অভিযোগের প্রকৃত চিত্র তদন্ত শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।










