বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) একটি বড় প্রকল্পের পাইলিং কাজে অনুমোদিত নকশা ও নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন মানা হয়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে পাইলের ব্যাস ও দৈর্ঘ্য কমানো এবং নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে কম রড ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় ও কাজের হিসাব নিয়ে যেমন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতে স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবুল কালাম আজাদ মোল্লা এবং মূল ঠিকাদার আরশাদ পারভেজ। অভিযোগকারীদের দাবি, কার্যাদেশে যে ধরনের পাইলিং করার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে ছোট আকারের পাইল তৈরি করা হয়েছে। অথচ এসব কাজের বিপরীতে বিল প্রস্তুত ও অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে কি না, সেটি যাচাই করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পের অনুমোদিত কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথিতে প্রতি পাইলের ব্যাস ৫০০ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ৪০ দশমিক ৫০ মিটার রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি পাইলের জন্য ১৬ মিলিমিটার ব্যাসের ১০টি রড ব্যবহারের কথা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, বাস্তবে ৫০০ মিলিমিটারের পরিবর্তে প্রায় ৩০০ মিলিমিটার ব্যাসের পাইল করা হয়েছে। একইভাবে নির্ধারিত ৪০ দশমিক ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের বদলে প্রায় ২৩ মিটার দৈর্ঘ্যের পাইল ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
শুধু পাইলের আকারেই নয়, রড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পার্থক্যের অভিযোগ রয়েছে। কার্যাদেশে ১০টি রড ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে সাতটি রড ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অর্থাৎ নকশা অনুযায়ী পাইলের ব্যাস, দৈর্ঘ্য ও রডের সংখ্যা—তিন ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনার অভিযোগ সামনে এসেছে।
এ ধরনের পরিবর্তন যদি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলগত অনুমোদন ছাড়া করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি শুধু আর্থিক অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারণ কোনো স্থাপনার ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রে পাইলের ব্যাস, গভীরতা, দৈর্ঘ্য এবং রডের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় প্রকৌশলগত হিসাবের ভিত্তিতে। তাই অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে এসব পরিবর্তন করা হলে স্থাপনার ধারণক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের মূল অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করে সাইটে ‘TYPE-1’ ও ‘TYPE-2’ নামে দুটি বিকল্প ড্রয়িং ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ড্রয়িংয়ের মাধ্যমে পাইলিংয়ের আকার বা নির্মাণ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়ে থাকলে তার পেছনে কার অনুমোদন ছিল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রকল্পের মূল নকশা পরিবর্তন করতে হলে সাধারণত সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের যাচাই, প্রয়োজনীয় কারিগরি মতামত এবং অনুমোদন প্রয়োজন হয়। সংশোধিত নকশা অনুমোদনের পরই তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের সুযোগ থাকার কথা। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, ‘TYPE-1’ ও ‘TYPE-2’ ড্রয়িং ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন ও ভেটিংয়ের বিষয়টি পরিষ্কার নয়।
এই দুটি ড্রয়িং কে তৈরি করেছেন, কোন কর্তৃপক্ষ তা অনুমোদন করেছে এবং মূল ডিজাইনের পরিবর্তনের আগে কোনো কারিগরি কমিটি বা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় নথিপত্র যাচাই করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাইলিংয়ের কাজ কম করার পাশাপাশি বিল তৈরিতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাস্তবে যতটুকু কাজ করা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি কাজ দেখিয়ে মাপবই (এমবি) এবং রানিং বিল তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি অর্থের অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, এসব বিলের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লা ও ঠিকাদার আরশাদ পারভেজের মধ্যে অর্থ ভাগাভাগি হয়েছে। মূল কার্যাদেশ, বিল অব কোয়ান্টিটিজ বা BOQ, মাপবই, রানিং বিল, পেমেন্ট ভাউচার এবং প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের নথি পর্যালোচনা করার পাশাপাশি সরেজমিনে পাইলের ব্যাস ও গভীরতা পরিমাপ করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের পাইলিংয়ের রড সংক্রান্ত কাজ ‘মায়ের দোয়া কনস্ট্রাকশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। মূল ঠিকাদার আরশাদ পারভেজের অধীনে থাকা কাজ অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সরকারি প্রকল্পে সাব-কন্ট্রাক্টের সুযোগ থাকলে সেটি টেন্ডার ডকুমেন্ট ও মূল চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হতে হয়। কোথাও অনুমোদন প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত সম্মতিও থাকার কথা। তাই ‘মায়ের দোয়া কনস্ট্রাকশন’ কীভাবে এই কাজে যুক্ত হলো, প্রতিষ্ঠানটির যোগ্যতা কী ছিল এবং এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন ছিল কি না—এসব তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লার পক্ষ থেকে পাঠানো ঠিকাদারি লাইসেন্স এবং কথিত সাব-কন্ট্রাক্টের মধ্যে কী সম্পর্ক রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করা দরকার বলে অভিযোগকারীরা মনে করছেন।
প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, তৎকালীন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর এপিএস বাশার এবং ঠিকাদার আরশাদ পারভেজের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজের গুণগত মানের চেয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে কেউ তথ্য সংগ্রহ বা প্রশ্ন করলে তাকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এমনকি কথিত ভাড়াটে লোকজন ব্যবহার করে সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক প্রভাব, ভয়ভীতি কিংবা অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেন এবং প্রকল্পের প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এই প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা বের করতে প্রথমেই দেখা প্রয়োজন কার্যাদেশে ৫০০ মিলিমিটার ব্যাস ও ৪০ দশমিক ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের পাইল নির্ধারণের পর তা কীভাবে ৩০০ মিলিমিটার ও ২৩ মিটারে নামিয়ে আনা হলো। এই পরিবর্তনের লিখিত অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে ১০টির পরিবর্তে সাতটি রড ব্যবহারের অনুমতি কে দিয়েছেন, তার কোনো লিখিত নথি রয়েছে কি না, ‘TYPE-1’ ও ‘TYPE-2’ ড্রয়িং কারা তৈরি করেছেন এবং কোন কর্তৃপক্ষ তা অনুমোদন করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি প্রকল্পের মাপবইয়ে কী পরিমাণ কাজ দেখানো হয়েছে এবং বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে, তার তুলনা করা জরুরি। ঠিকাদার আরশাদ পারভেজকে যে পরিমাণ বিল দেওয়া হয়েছে, সেটি বাস্তব কাজের পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।
‘মায়ের দোয়া কনস্ট্রাকশন’-কে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল চুক্তিতে অনুমোদন ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত সম্মতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তাও তদন্তের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
প্রকল্পের পাইলিংয়ের কাজে অনিয়ম হয়ে থাকলে এর প্রভাব শুধু সরকারি অর্থের ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে ওই পাইলের ওপর নির্মিত স্থাপনার ভার বহনের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে পাইলের গভীরতা, ব্যাস ও রডের পরিমাণ প্রকৌশলগত হিসাবের বাইরে কমানো হলে কাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
এ কারণে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে শুধু কাগজপত্র দেখলেই হবে না; প্রয়োজনে প্রকল্পের পাইলগুলো প্রযুক্তিগতভাবে পরীক্ষা করাও প্রয়োজন। প্রকল্পের অনুমোদিত ডিজাইন, সংশোধিত ডিজাইন, ভেটিং নথি, BOQ, মাপবই, রানিং বিল, অর্থ পরিশোধের রেকর্ড, ব্যাংক লেনদেন, পাইলের বাস্তব মাপ এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার রিপোর্ট একসঙ্গে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
বিআইডব্লিউটিএর গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব কাজের পার্থক্য, বিকল্প ড্রয়িংয়ের বৈধতা, পাইলের প্রকৃত মাপ, ব্যবহৃত রডের সংখ্যা, বিল-ভাউচারের যথার্থতা এবং সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়ার প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
এখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সামনে মূল বিষয় হলো—প্রকল্পের নকশা ও কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ হয়েছে কি না, পরিবর্তন করা হয়ে থাকলে তার অনুমোদন ছিল কি না এবং সরকারি অর্থের বিপরীতে বাস্তবে যথাযথ কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে স্বাধীন প্রকৌশলগত ও আর্থিক তদন্ত প্রয়োজন।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সরকারি অর্থের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে তা উদ্ধারের পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রকৌশলগত পরীক্ষার মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করা দরকার। এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়মের সুযোগও কমবে।








