ওয়াসার প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও চাকরিবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠন করেও দেড় বছরে প্রতিবেদন দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ—প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক জবাবদিহি

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক মো. আব্দুল মজিদের বিরুদ্ধে নিজের আওতাধীন প্রকল্পে স্ত্রীকে ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়া, সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার প্রভাব খাটানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পর তদন্ত কমিটি গঠনের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই তদন্তের কোনো প্রতিবেদন জমা হয়নি। ফলে তদন্তের নামে অভিযোগটি কার্যত চাপা পড়ে আছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

ওয়াসার কর্মকর্তাদের একাংশের প্রশ্ন—১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও দেড় বছরেও কেন প্রতিবেদন দেওয়া হলো না? তদন্ত কমিটির নিষ্ক্রিয়তার পেছনে কারও প্রভাব বা হস্তক্ষেপ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। এ অবস্থায় কেউ কেউ এখন ‘তদন্ত কমিটির বিষয়েই তদন্ত কমিটি’ গঠনের দাবি তুলেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, মো. আব্দুল মজিদ ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি ওয়াসা মডস্ সার্কেল-১-এ কর্মরত ছিলেন। ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে নিজের প্রভাবাধীন এলাকায় স্ত্রীকে ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে।

সরকারি কর্মকর্তা হয়েও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান : অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আব্দুল মজিদের স্ত্রী তামান্না শারমিন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত একজন সরকারি কর্মকর্তা। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তিনি ‘প্রিমিয়াম কোয়ালিটি’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ, জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধনের সময় সরকারি চাকরির তথ্য গোপন করে নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন তামান্না শারমিন। শুধু তাই নয়, কোম্পানির নথিপত্রে স্ত্রীর অফিসের ঠিকানা-সংক্রান্ত কাগজে আব্দুল মজিদ নিজেই সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়।

নথিতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বাসার ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—বাসা নম্বর ১০/সি, অনামিকা কনকর্ড, ৫৮৩ রোকেয়া সরণি, শেওড়াপাড়া, মিরপুর।

চাকরিবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ : সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা তাঁর ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি সরকারের ঠিকাদারি বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারেন না। ফলে একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তামান্না শারমিনের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হওয়ার বিষয়টি গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে তদন্ত প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে আটকে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনাটি জানাজানি এবং গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর তামান্না শারমিন দ্রুত ওই কোম্পানির মালিকানা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন বলে জানা গেছে। তবে নাম প্রত্যাহারের আগে তিনি কীভাবে কোম্পানির চেয়ারম্যান হলেন, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধিত হলো এবং ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার কোনো কাজের সম্পর্ক ছিল কি না—এসব প্রশ্নের সুরাহা এখনো হয়নি।

দেড় বছরেও তদন্ত শেষ হয়নি : ঘটনার পর গত বছরের ১৯ মার্চ ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে।

কমিটির আহ্বায়ক করা হয় ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সিনিয়র সহকারী সচিব রাসেদুজ্জামানকে। সদস্য হিসেবে রাখা হয় উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিব আহমেদকে এবং শ্রম ও কল্যাণ বিভাগের উপ-সচিব নুরুজ্জামান মিয়াজিকে করা হয় সদস্য সচিব। তদন্ত কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্ধারিত সময় পেরিয়ে দেড় বছর পার হলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—তদন্ত কমিটি কি আদৌ কার্যকরভাবে কাজ করেছে ? যদি কাজ করে থাকে, তাহলে প্রতিবেদন কোথায় ? আর যদি তদন্ত সম্পন্ন না হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে তা আটকে থাকার কারণই বা কী ?

তদন্ত কমিটির বিষয়েই তদন্ত কমিটি’ গঠনের দাবি : ওয়াসা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই তদন্ত শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে না। এতে অভিযোগকারীদের মধ্যে যেমন হতাশা তৈরি হয়, তেমনি অভিযুক্ত কর্মকর্তারাও এক ধরনের দায়মুক্তির সুযোগ পেয়ে যান। মজিদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাই দীর্ঘদিনেও প্রতিবেদন না দেওয়ার কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনে তদন্ত কমিটির কার্যক্রম ও নিষ্ক্রিয়তা নিয়েই পৃথক তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে।

আগের সরকারের ‘বিশেষ সুবিধাভোগী’, বর্তমানেও প্রভাবশালী ? ঢাকা ওয়াসার একটি সূত্রের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিশেষ সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবে আবুল মজিদ ওয়াসায় প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। বর্তমান সরকারের সময়েও তিনি প্রভাব ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রটির আরও দাবি, বিএনপির এক নেতার আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ধামাচাপা দিয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। তবে বিএনপির ওই নেতার সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদকের হাতে নেই। একইভাবে তাঁর রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহার করে কোনো অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ছাড়া চূড়ান্তভাবে বলা যায় না।

একাধিক প্রশ্নের উত্তর নেই :
সব মিলিয়ে আব্দুল মজিদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি—সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তাঁর স্ত্রী কীভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হলেন ? প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধনের সময় সরকারি চাকরির তথ্য গোপন করা হয়েছিল কি না ? কোম্পানির নথিতে মজিদের সাক্ষর কেন রয়েছে ? তাঁর দায়িত্বাধীন সময়ে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার কোনো ঠিকাদারি কাজের সম্পর্ক ছিল কি না ? আর এসব অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটি দেড় বছরেও কেন প্রতিবেদন দিতে পারল না ? এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হলে অভিযোগের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা ওয়াসার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে একজন দায়িত্বশীল প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দেড় বছরেও তদন্ত শেষ না হওয়ার কারণও জনসম্মুখে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

  • Related Posts

    ইকুরিয়া বিআরটিএতে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

    ঢাকার কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সার্কেল-২ কার্যালয়। সরকারিভাবে এখান থেকে নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক সেবাগ্রহীতার দাবি, এখানে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমেনি, বরং নতুন কৌশলে…

    বন্ড কমিশনারেটে ৭০–৮০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ: কাস্টমস কর্মকর্তা রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে ঘুষ, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী কমিশনার রাসেল আল মামুনকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগ…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    ‘ভয় পাইছে, ভয় পাইছে’: সাক্ষীর উদ্দেশ্যে পলক

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১১, ২০২৬
    • 14 views
    ‘ভয় পাইছে, ভয় পাইছে’: সাক্ষীর উদ্দেশ্যে পলক

    এআই চালাবে যাত্রীবাহী যান, দুবাইয়ে নতুন যুগের পরিবহন

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১১, ২০২৬
    • 16 views
    এআই চালাবে যাত্রীবাহী যান, দুবাইয়ে নতুন যুগের পরিবহন

    শারদীয় ছুটিতে পাহাড়ে পর্যটকের ঢল নামার আশা, ৮০ শতাংশ রুম বুকিং শেষ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১১, ২০২৬
    • 14 views
    শারদীয় ছুটিতে পাহাড়ে পর্যটকের ঢল নামার আশা, ৮০ শতাংশ রুম বুকিং শেষ

    শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নদী খনন, বছর না যেতেই ডুবোচর: ড্রেজার চলে, বাড়ে না গভীরতা—বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিংয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থ অপচারের গুরুতর অভিযোগ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১১, ২০২৬
    • 38 views
    শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নদী খনন, বছর না যেতেই ডুবোচর: ড্রেজার চলে, বাড়ে না গভীরতা—বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিংয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থ অপচারের গুরুতর অভিযোগ

    চুল টেনে লাল কার্ড, ক্ষমা চাইলেন ভিনিসিয়ুস

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১১, ২০২৬
    • 15 views
    চুল টেনে লাল কার্ড, ক্ষমা চাইলেন ভিনিসিয়ুস

    ওয়াসার প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও চাকরিবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠন করেও দেড় বছরে প্রতিবেদন দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ—প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক জবাবদিহি

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১১, ২০২৬
    • 52 views
    ওয়াসার প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও চাকরিবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠন করেও দেড় বছরে প্রতিবেদন দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ—প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক জবাবদিহি