বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফিরোজ হাসানকে ঘিরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বড় সরকারি প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় কথিত প্রভাব বিস্তার, দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা, বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ এবং তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের উৎস—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে এসেছে।
সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, দরপত্রের স্বচ্ছতা এবং কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। তবে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলেই তা প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। কাজী মো. ফিরোজ হাসানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক তথ্য, সরকারি সিদ্ধান্ত এবং তাঁর বক্তব্য যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দীর্ঘ সময় থাকা নিয়ে প্রশ্ন
কাজী মো. ফিরোজ হাসান দীর্ঘ সময় ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ, বদলি, পদোন্নতি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় পদায়নের সময়কাল নিয়ে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে সরকারি কেনাকাটা, প্রকল্প পরিকল্পনা ও দরপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকার সময় প্রশাসনিক ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দায়িত্ব বণ্টন ও বদলির ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে নেওয়া হয়েছিল কি না এবং দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা বজায় ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি থেকেই পাওয়া সম্ভব।
তবে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করাই অনিয়মের প্রমাণ নয়। এ ক্ষেত্রে কোনো বিধি লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে কি না, তা নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।
বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণের ব্যয় নিয়েও যাচাইয়ের দাবি
ফিরোজ হাসানের বিদেশ সফর এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এসব সফরের জন্য কারা তাঁকে মনোনীত করেছিলেন, কী উদ্দেশ্যে সফরগুলো করা হয়েছিল, সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছিল কি না এবং সফর শেষে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল কি না—এসব তথ্য যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ। কিন্তু এ ধরনের সফরে সরকারি অর্থ ব্যয় হয়ে থাকলে তার অনুমোদন, ব্যয়ের হিসাব এবং সফরের উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট অনুমোদনপত্র, সফরের আদেশ, ব্যয়ের বিবরণ, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং সফর-পরবর্তী প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা যেতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এসব সফরে কোনো অনিয়ম হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
বড় প্রকল্পের দরপত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
কাজী মো. ফিরোজ হাসানকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো সরকারি প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় কথিত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। অনুসন্ধানে NDE নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর কথিত যোগসূত্র এবং বড় প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ও দরপত্রের শর্ত নির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মূল বিষয় হলো, প্রকল্পের পরিকল্পনা বা দরপত্রের শর্ত নির্ধারণের সময় কোনো নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল কি না।
সরকারি প্রকল্পে দরপত্রের শর্ত এমনভাবে তৈরি করা হলে, যাতে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যায় বা নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান অগ্রাধিকার পায়, তাহলে তা সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে কোনো প্রকল্পে NDE-এর অংশগ্রহণ কিংবা কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে পেশাগত যোগাযোগ থাকলেই অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য সুনির্দিষ্ট নথি ও প্রমাণ প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি, দরপত্র বিজ্ঞপ্তি, যোগ্যতার শর্ত, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, কার্যাদেশ, বিল পরিশোধের হিসাব এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন পরীক্ষা করা জরুরি। দরপত্রের শর্ত তৈরির সময় কারা মতামত দিয়েছেন, কোনো পরিবর্তন করা হয়ে থাকলে তার কারণ কী ছিল এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কে অনুমোদন করেছেন—এসব তথ্য যাচাই করলে অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়েও একইভাবে পরিকল্পনা, দরপত্র, কার্যাদেশ ও অর্থ ছাড়ের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকলে তা নথির মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব। তবে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা অনিয়মের প্রমাণ এই প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা যায়নি।
নিজের ও পরিবারের সম্পদের উৎস যাচাইয়ের দাবি
কাজী মো. ফিরোজ হাসান এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, সরকারি চাকরি থেকে অর্জিত বৈধ আয় এবং পরিবারের নামে থাকা সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে তাঁর আয়কর বিবরণী, সম্পদ বিবরণী, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল, গাড়ির মালিকানা এবং প্রাসঙ্গিক আর্থিক লেনদেনের তথ্য আইনসম্মতভাবে যাচাই করা যেতে পারে। কোনো সম্পদ কখন কেনা হয়েছে, ক্রয়ের অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং সম্পদের মূল্য ও ঘোষিত আয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা সম্ভব।
পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ থাকলে তার মালিকানা ও অর্থের উৎসও প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করা যেতে পারে। তবে পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পত্তি থাকা নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। একইভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো সম্পদকে অবৈধ বা আয়বহির্ভূত বলার সুযোগ নেই।
এখন পর্যন্ত ফিরোজ হাসান কিংবা তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদের নির্দিষ্ট পরিমাণ, মালিকানা এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি এই প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড ও আর্থিক তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় দুদক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত নিরীক্ষা ও তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে বিষয়গুলো যাচাই করার দাবি উঠেছে। তদন্তের ক্ষেত্রে শুধু অভিযোগের বিবরণ নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, আর্থিক লেনদেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং দায়িত্ব পালনসংক্রান্ত তথ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে ফিরোজ হাসানের সম্পদের উৎস ও ঘোষিত আয়ের সামঞ্জস্য, বিদেশ সফরের অনুমোদন ও ব্যয়, বড় প্রকল্পের দরপত্রে তাঁর ভূমিকা এবং কোনো নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ থাকলে তার পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ পরীক্ষা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে এ বিষয়ে আগে কোনো বিভাগীয় তদন্ত, নিরীক্ষা বা আইনগত কার্যক্রম হয়ে থাকলে তার বর্তমান অবস্থাও জানা প্রয়োজন। পূর্বে কোনো অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হয়ে থাকলে সেই তদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা যাচাই করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া না গেলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও বজায় থাকবে।
বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা
কাজী মো. ফিরোজ হাসানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। একইভাবে গণপূর্ত অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষ কিংবা অন্য কোনো দায়িত্বশীল দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে সেসব তথ্যও যাচাই করে প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তই প্রত্যাশা
সরকারি প্রকল্পের দরপত্র, অর্থ ব্যয় এবং কর্মকর্তাদের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা জনস্বার্থে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ এসব বিষয়ের সঙ্গে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি সরাসরি যুক্ত।
কাজী মো. ফিরোজ হাসানকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে অনুমান বা আলোচনার পরিবর্তে নথিভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন। দরপত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, বিদেশ সফরের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কি না এবং সম্পদের উৎস বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।
এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো যাচাইয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং প্রয়োজনীয় নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায় কি না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রমাণিত না হলে বিষয়টি স্পষ্ট করা—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।








