গণপূর্ত অধিদপ্তরে বদলি-পদায়নের লটারি ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ, গ্রেডিং শিটে কারসাজি ও ১২০ কোটি টাকার লেনদেনের দাবি

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলে লটারি পদ্ধতি চালু করা হলেও এর আড়ালে পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো, গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন এবং ক্যাটাগরি নির্ধারণে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে প্রায় ১২০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ থাকা কয়েকজন প্রকৌশলীও আবার গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলীদের পদায়নের আগে তাঁদের চাকরির অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা, কাজের দক্ষতা, সততা এবং বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। বরং কর্মকর্তাদের এ প্লাস, এ, বি, সি ও ডি—এই পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। কিন্তু কারা কোন ক্যাটাগরিতে পড়বেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কী ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। এমনকি ক্যাটাগরি নির্ধারণের লিখিত নীতিমালা, মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত কিংবা অনুমোদনের কাগজপত্রও প্রকাশ করা হয়নি। অভিযোগকারীদের মতে, এই অস্পষ্টতার সুযোগেই লটারির ফলাফল প্রভাবিত করার ব্যবস্থা করা হয়।

এ ঘটনায় নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস, আ ন ম মাজহারুল ইসলাম, মো. জিয়াউর রহমান, মাসুম বিল্লাহ, রেজা তৈমুর মালিক, রাশেদ আহসান ও রাজিবুল ইসলামের নাম আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান (বিপ্লব), অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ফিরোজ আলম, সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অর্ণব বিশ্বাসের বিরুদ্ধে একাধিক প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এবং সংস্কার প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত মেডিকেল উপবিভাগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় নিউরো সায়েন্স হাসপাতালের প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এ ছাড়া নিটোর, মেন্টাল হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এবং হৃদরোগ হাসপাতালের ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন প্রকল্পেও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

এসব প্রকল্পে ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রতিবছর বিভিন্ন মেরামতের কাজও করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এপিপি এবং স্বাস্থ্য মেরামত খাত ১৩৮-এর বরাদ্দের অর্থ ব্যয় নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। কাজের পরিমাণ, প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, বিল এবং বাস্তবে সম্পন্ন হওয়া কাজের মধ্যে কোনো অসংগতি ছিল কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগে পদায়ন পেতে অর্ণব বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ লটারির মাধ্যমে সিলেট গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পেতেও তিনি বিপুল অর্থ খরচ করেছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি, বিল, ব্যাংক লেনদেন এবং সম্পদের হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অর্ণব বিশ্বাস বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি হল শাখার ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং গণপূর্ত বিভাগের রিজার্ভে কর্মরত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি বিশেষ সুবিধা পেয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তাঁর দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পের কাজ, অর্থ ব্যয় এবং আর্থিক স্বচ্ছতা যাচাই করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পদায়ন প্রক্রিয়ায় ফিরোজ আলম ও সারোয়ার জাহানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

গণপূর্ত অধিদপ্তরে আগের সরকারের সময় সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তাকে আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন) ফিরোজ আলম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান (বিপ্লব) এবং নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, বদলি ও পদায়নের পুরো প্রক্রিয়ায় একটি প্রভাবশালী মহল কাজ করেছে। এই মহল কীভাবে ক্যাটাগরি নির্ধারণ, গ্রেডিং এবং লটারির ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

গত ১৩ অক্টোবর ২০২৬ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নের জন্য লটারি অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, লটারির সময় একাধিক বাক্সে আলাদাভাবে কর্মকর্তাদের নাম রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এতে পছন্দের কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট কর্মস্থলে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়। ঢাকার চার থেকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের জন্য আগেই কয়েকজন কর্মকর্তার নাম নির্ধারণ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এরপর ১৫ অক্টোবর ২০২৬ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপনে রেজা তৈমুর মালিককে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে পদায়ন করা হয়। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, কোন যোগ্যতা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে তাঁকে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলো? ক্যাটাগরি নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় তাঁর অবস্থান কী ছিল এবং পদায়নের আগে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক যাচাই করা হয়েছিল কি না, সেটিও পরিষ্কার করা দরকার।

গ্রেডিং শিট পরিবর্তন করে পছন্দের কর্মকর্তাদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ

লটারির আগেই গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন আনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আ ন ম মাজহারুল ইসলাম এবং মো. জিয়াউর রহমানকে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের সুযোগ করে দিতে মূল্যায়ন তালিকায় কারসাজি করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান (বিপ্লব) এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীদের ভূমিকা তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী বিপ্লব, মাজহার ও জিয়ার ভূমিকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

আ ন ম মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তিনি ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩, রেলওয়ে ডিভিশন এবং প্রকল্প বিভাগ-৫-এ দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০০-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়ার সময় তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

অন্যদিকে, মো. জিয়াউর রহমান সংস্থাপন-২ শাখায় দায়িত্ব পালনের পর শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এ পদায়ন পেয়েছেন। এ বিভাগের অধীনে সংসদ ভবন ও এমপি হোস্টেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনার দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা, পেশাগত যোগ্যতা, চাকরির রেকর্ড এবং বদলি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মাসুম বিল্লাহর পদায়ন নিয়েও বিতর্ক

নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। তিনি সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, আমির হোসেন আমুর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি আগে নগর গণপূর্ত বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন পেয়েছিলেন।

এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করার দাবি উঠেছে। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মবিভাগ। এর অধীনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিভিন্ন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ রয়েছে। তাই এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পদায়নের ক্ষেত্রে তাঁর নিয়োগসংক্রান্ত নথি, চাকরির অভিজ্ঞতা এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।

এক মাসে প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীর বদলি

গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক বদলি-পদায়নের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (ইলেকট্রোমেকানিক্যাল), ২০০ জন সহকারী প্রকৌশলী, ২১৯ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং ১২০ জন নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এ সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।

এত অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার বদলির পাশাপাশি সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সদরদপ্তর এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়ন নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

অভিযোগকারীদের একটি অংশের দাবি, আগামী ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক তৎপরতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বসানো হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে অতীতে যুক্ত ছিলেন এমন ব্যক্তিদের পদায়নের বিষয়টিও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তবে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে তাঁর চাকরির রেকর্ড, আর্থিক কর্মকাণ্ড, দায়িত্ব পালনের ইতিহাস এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে পদায়ন ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীকে ঘিরে নতুন করে কমিশন বাণিজ্য ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান মুন্সী ওরফে টিপু মুন্সির ভায়রা। এই পারিবারিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এ পদায়ন পেতে তিনি প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

আবু নাসের চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘদিন গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দরপত্র বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে প্রাক্কলন অনুমোদন, দরপত্রের টেকনিক্যাল অনুমোদন এবং ভেরিয়েশন অনুমোদনের ক্ষেত্রে কমিশন দাবির অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ই-জিপি দরপত্রে ৫ শতাংশ কমিশন না দিলে তিনি টেকনিক্যাল অনুমোদন দিতে চাইতেন না। যারা কমিশন দিতে রাজি হতেন না, তাঁদের দরপত্রের অনুমোদন আটকে রাখা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ ও বিভাগ-৪-এর একাধিক দরপত্রের টেকনিক্যাল অনুমোদন তাঁর ই-জিপি আইডিতে আটকে থাকার কথাও জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ই-জিপি রেকর্ড, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, অনুমোদনের সময়সীমা এবং ঠিকাদারদের বক্তব্য যাচাই করলেই অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

বগুড়ায় দরপত্র পদ্ধতি পরিবর্তন করে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ

বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দ এবং এপিপির বিভিন্ন কাজের দরপত্র ওপেন টেন্ডারিং মেথড বা ওটিএম পদ্ধতিতে আহ্বানের অনুমতি দেওয়া হয়। অথচ এসব কাজের ক্ষেত্রে লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড বা এলটিএম ব্যবহারের সুযোগ ছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। দরপত্রের পদ্ধতি পরিবর্তনের বিনিময়ে প্রায় ১০ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় একাধিক দরপত্র আইডির কথা উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা। সেগুলো হলো—1111781, 1119316, 1113079, 1111563, 1111558, 1111559, 1111560, 1111570, 1111567, 1111569, 1111561, 1111564, 1111565, 1111566, 1081546, 1100790, 1102028, 1091973, 1091974, 1091975, 1091976, 1091977, 1091978, 1091979, 1082159, 1080235, 1080236, 1069131, 1070874, 1070875, 1070876, 1071265, 1043248, 1029596 এবং 1018159।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব দরপত্রের অনুমোদন, প্রাক্কলন, দরপত্র পদ্ধতি পরিবর্তনের কারণ, কার্যাদেশ এবং বিলের নথি পরীক্ষা করলে অনিয়মের বিষয়টি পরিষ্কার হবে। বিশেষ করে কোন যুক্তিতে ওটিএম পদ্ধতি অনুমোদন করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কোনো আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।

রাজিবুল ইসলাম ও রাশেদ আহসানের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন

নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিবুল ইসলামের পদায়ন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। তিনি ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ থেকে মহাখালীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর আবার একই বিভাগে পদায়ন পাওয়ায় তাঁর বদলির ধারাবাহিকতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

অন্যদিকে, নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আহসান সাবেক মন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর মিরপুর এবং বর্তমানে আজিমপুর-সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে তাঁর পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অতীতের রাজনৈতিক যোগাযোগ তাঁর পদায়নে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

রেজা তৈমুর মালিকের পদায়নে স্পর্শকাতর স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে রেজা তৈমুর মালিকের পদায়ন নিয়েও ব্যাপক আলোচনা চলছে। কারণ, এ বিভাগের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, বিভিন্ন মন্ত্রী ও সচিবের বাসভবন, এনএসআই, দুদক এবং ডিজিএফআইয়ের প্রধান কার্যালয়সহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারকাজ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ১৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত লটারির মাধ্যমে রেজা তৈমুর মালিককে এ বিভাগে পদায়নের জন্য নির্বাচন করা হয়। পরে ১৫ অক্টোবর ২০২৬ প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপনে তাঁর পদায়ন চূড়ান্ত করা হয়। তাঁদের প্রশ্ন, এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার আগে তাঁর চাকরির ইতিহাস, নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য, অতীত কর্মকাণ্ড এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই করা হয়েছিল কি না।

অভিযোগে রেজা তৈমুর মালিকের পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর বাবা মো. রেজাউল হক মালিক ওরফে মুকুল চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি মারা যান। তাঁর বাড়ি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বাজারপাড়া এলাকায় ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, রেজাউল হক মালিক সাবেক সংসদ সদস্য সেলুন জোয়াদ্দারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

এ ছাড়া রেজা তৈমুর মালিকের বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ এবং পরবর্তী পদায়নের প্রক্রিয়াও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তাঁর নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, পরীক্ষার ফলাফল এবং নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।

নিম্নমানের কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ

রেজা তৈমুর মালিকের বিরুদ্ধে পিডব্লিউডি সিডিউলে নিম্নমানের একটি কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন একাধিক সূত্র। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে তা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজের মানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তালিকাভুক্তির আবেদন, যোগ্যতার কাগজপত্র, পণ্যের মান যাচাই এবং অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া তদন্ত করা প্রয়োজন।

পুরোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ছবি সামনে এনে পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগকারীরা ২০১৬ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের একটি জনসভায় অংশ নেওয়ার কিছু ছবির কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁদের দাবি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাওয়ার পর আয়োজিত জনসভায় নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আহসান, সুব্রত বিশ্বাস এবং রেজা তৈমুর মালিক উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা ওই সময়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় এসব কর্মকর্তা অধিদপ্তরের ভেতরে প্রভাব বিস্তার এবং অন্য কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ছবি, সংশ্লিষ্ট সময়ের নথি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁদের প্রশ্ন, অতীতের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের বিষয়টি প্রশাসন যথাযথভাবে বিবেচনা করেছে কি না।

এর আগে উপসহকারী প্রকৌশলী নিমিতোশ ওজাকে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের অধীনে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে দায়িত্ব দেওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। পরে তাঁকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে বদলি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীরা মনে করছেন, আগের ঘটনাটি বিবেচনায় নিয়ে রেজা তৈমুর মালিকের পদায়নও পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

লটারিতে কর্মকর্তাদের বাছাই নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ

লটারির মাধ্যমে পদায়নের ক্ষেত্রে সব কর্মকর্তার জন্য সমান সুযোগ রাখা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পূর্তভবন-সংশ্লিষ্ট পদে শামসুন্নাহার ঝুমার নাম লটারিতে উঠলেও একই পর্যায়ের অন্য কর্মকর্তাদের নাম কেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। একইভাবে লিবনী জামানকে হবিগঞ্জে পদায়ন করা হলেও তাঁর সমপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকে লটারির বাইরে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই পদমর্যাদার প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তা বহাল থাকা সত্ত্বেও কেন নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে লটারির আওতায় আনা হলো এবং অন্যদের বাদ দেওয়া হলো, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের মতে, লটারির আগে কারা অংশগ্রহণের যোগ্য ছিলেন, কারা বাদ পড়েছেন এবং কীভাবে নাম নির্বাচন করা হয়েছে, এসব তথ্য প্রকাশ না করলে পুরো প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

১২০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের মাধ্যমে প্রায় ১২০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে।

এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আয়কর বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, সম্পদের বিবরণী, জমি ও ফ্ল্যাট কেনার তথ্য এবং নিকটাত্মীয়দের নামে অর্জিত সম্পদের উৎস পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি লটারির মূল নথি, গ্রেডিং শিটের আগের ও পরের কপি, সংশোধনের তারিখ, সংশোধনকারী কর্মকর্তার পরিচয় এবং অনুমোদনকারী ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের মতে, শুধু চূড়ান্ত পদায়ন আদেশ দেখলে পুরো অনিয়মের চিত্র পাওয়া যাবে না। এর জন্য ক্যাটাগরি নির্ধারণ থেকে শুরু করে লটারির প্রস্তুতি, নাম বাছাই, বাক্সে নাম রাখা, ফলাফল ঘোষণা এবং পরবর্তী পদায়ন আদেশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা করতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়ন নিয়ে বদিউল আলম মজুমদারের উদ্বেগ

গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির বাসভবন, মন্ত্রীদের বাসভবন, ডিজিএফআইয়ের প্রধানের বাসভবনসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি মনে করেন, এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কোনো কর্মকর্তার রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত পরিচয় বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগ থাকলে তা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। যথাযথ অনুসন্ধান ছাড়া এমন দায়িত্ব দেওয়া হলে সরকারের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যাঁরা এসব কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাঁদের ভূমিকা খতিয়ে দেখারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা থাকলে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। তাই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতা, বিশ্বস্ততা এবং দায়িত্ব পালনের রেকর্ড যাচাই করা উচিত। তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে অভিযোগকারীদের দাবি, সাম্প্রতিক বদলি-পদায়ন এবং লটারি পদ্ধতির পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। বিশেষ করে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে কর্মকর্তাদের ভাগ করার লিখিত নীতিমালা, মূল্যায়নের পদ্ধতি, গ্রেডিং শিটের মূল কপি এবং পরবর্তী সময়ে কোনো পরিবর্তন করা হয়ে থাকলে তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে।

১৩ অক্টোবর ২০২৬ অনুষ্ঠিত লটারির কার্যবিবরণী, উপস্থিত কর্মকর্তাদের তালিকা, ব্যবহৃত বাক্স, অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের নাম এবং লটারির পুরো প্রক্রিয়ার রেকর্ড পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ১৫ অক্টোবরের পদায়ন প্রজ্ঞাপনসহ সংশ্লিষ্ট সব বদলি আদেশের প্রশাসনিক ভিত্তি যাচাই করতে হবে।

অর্ণব বিশ্বাসের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হাসপাতালগুলোর প্রকল্প, এপিপি এবং স্বাস্থ্য মেরামত খাত ১৩৮-এর ব্যয়ের হিসাব, কার্যাদেশ ও বিল পরীক্ষা করার দাবি রয়েছে। আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ যাচাইয়ে তাঁর ই-জিপি আইডির কার্যক্রম, বগুড়ার ওটিএম দরপত্র, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২, সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, এনএসআই, দুদক ও ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। কথিত ১২০ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব এবং সম্পদের উৎস পরীক্ষা করারও দাবি জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি যেসব প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগকারীদের কাছে থাকা তথ্য-প্রমাণের সত্যতা যাচাই করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে এবং নির্দোষ কর্মকর্তারাও অযথা বিতর্কের বাইরে থাকতে পারবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে গণপূর্তের বদলি-পদায়ন নিয়ে বিতর্ক বাড়বে

গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন নির্মাণ, উন্নয়ন, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নের সঙ্গে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহারও জড়িত। ফলে এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

অর্ণব বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন হাসপাতাল প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, আবু নাসের চৌধুরীকে ঘিরে কমিশন বাণিজ্যের দাবি, রেজা তৈমুর মালিকের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন, আ ন ম মাজহারুল ইসলাম ও মো. জিয়াউর রহমানের গ্রেডিং শিটে কারসাজির অভিযোগ এবং মাসুম বিল্লাহ, রাশেদ আহসান ও রাজিবুল ইসলামের পদায়ন নিয়ে বিতর্ক—সবকিছুই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।

এখন মন্ত্রণালয়ের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়নে লটারি পদ্ধতি কি সত্যিই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে, নাকি এর আড়ালে আগে থেকেই নির্ধারিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে? প্রায় ১২০ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেনের অভিযোগের কোনো সত্যতা আছে কি না, সেটিও নথিপত্র ও আর্থিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্মান ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি।

  • Related Posts

    হারতায় ক্যামেরা চুরির ঘটনায় জাহিদ গ্রেপ্তারের দাবি, জাকিরকে নিয়ে প্রশ্ন

    নিজেস্ব প্রতিনিধি: বরিশালের উজিরপুর উপজেলার হারতা এলাকায় এক পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ি থেকে ছয়টি সিসি ক্যামেরা চুরির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জাহিদ বালী (২০), জাকির বালী (৪৮) এবং অজ্ঞাতনামা আরও তিন…

    চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ, দুই কর্মকর্তার ভূমিকা তদন্তের দাবি

    নিজেস্ব প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে আমদানি করা পণ্য খালাস ও আনস্টাফিং কার্যক্রম পরিচালনায় বিলম্ব, ফাইল আটকে রাখা এবং সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সহকারী…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো চুরি, অর্ধেক উদ্ধারের দাবি বাইন্যান্সের

    • By admin admon
    • অক্টোবর ৩১, ২০২৬
    • 6 views
    ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো চুরি, অর্ধেক উদ্ধারের দাবি বাইন্যান্সের

    চাকরির বেতন ১০ হাজার, ব্যাংকে ঢুকল ১০ হাজার কোটি

    • By admin admon
    • অক্টোবর ৩১, ২০২৬
    • 3 views
    চাকরির বেতন ১০ হাজার, ব্যাংকে ঢুকল ১০ হাজার কোটি

    মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিকেল ফি নির্ধারণ

    মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিকেল ফি নির্ধারণ

    মালয়েশিয়া যেতে ৬-৭ লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ৩১, ২০২৬
    • 8 views
    মালয়েশিয়া যেতে ৬-৭ লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগ

    মার্কিন নির্বাচনে ভোট দিয়ে ইতিহাস গড়লেন পোপ লিও

    • By admin admon
    • অক্টোবর ৩১, ২০২৬
    • 4 views
    মার্কিন নির্বাচনে ভোট দিয়ে ইতিহাস গড়লেন পোপ লিও

    সৌদির তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল লক্ষ্য করে একের পর এক ড্রোন হামলা

    • By admin admon
    • অক্টোবর ৩১, ২০২৬
    • 4 views
    সৌদির তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল লক্ষ্য করে একের পর এক ড্রোন হামলা