খেলাধুলা ডেস্কঃ জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর অধীনে আট বছর ধরে কাজ করার পর সরে দাঁড়াচ্ছেন ফিফা শীর্ষ আইনজীবী এমিলিও গার্সিয়া সিলভেরো। চলতি বছরের অনুষ্ঠিত হওয়া বিশ্বকাপে তার নেওয়া বিভিন্ন শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের ওপর তীব্র নজরদারি ছিল।শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এমিলিও গার্সিয়া সিলভেরো তার কর্মজীবনে নতুন অধ্যায় শুরুর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সেবায় বিদেশে ১৫ বছর কাজ করার পর তিনি স্পেনে ফিরে যেতে চান।
ফিফার আইনি ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের প্রধান হিসেবে গার্সিয়া বিশ্বজুড়ে টুর্নামেন্ট সংক্রান্ত শাস্তিমূলক বিষয়, খেলোয়াড় স্থানান্তরের নিয়ম এবং চুক্তিসংক্রান্ত বিরোধগুলো তদারকি করতেন। এছাড়া ২০২৩ সালে ফিফার আইনি বিভাগকে জুরিখ থেকে মায়ামিতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। গার্সিয়া ফিফার আইনি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন মামলার নথিপত্র ও রায় জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন; যার মধ্যে কোন কোন ক্লাবকে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় স্থানান্তর বাজার থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তার তালিকাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ফিফার বিবৃতিতে গার্সিয়া বলেন, বিশ্বজুড়ে সহকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে উন্নত করার কাজ করাটা সত্যিই স্বপ্নের মতো ছিল। এর আগে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফাতে কাজ করার সময় থেকেই গার্সিয়া ইনফান্তিনোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৬ সালে ইনফান্তিনো প্রথমবারের মতো ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার দুই বছর পর তিনি তার সঙ্গে জুরিখে চলে আসেন।
জুলাই মাস থেকে ফিফায় ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিনি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে বিশ্বকাপের কিছু অংশ জোশ কুশনারসহ বিভিন্ন বেসরকারি বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রি করার পরিকল্পনা করেছিলেন। ফিফার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরসহ বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে ইনফান্তিনো কয়েক দিনের মধ্যেই সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন।
পরবর্তীতে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ জানায়, বিতর্কিত এই পরিকল্পনাটি এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ফিফার ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার ভোটাভুটিতে ইনফান্তিনোর পক্ষেই ভোট দিয়েছিলেন গার্সিয়া। এরপর থেকে উয়েফা ইনফান্তিনোকে ফিফা সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া, বিশ্বকাপের মাঠের খেলার ওপর প্রভাব ফেলে এমন শাস্তিমূলক বিষয়গুলোতে ইনফান্তিনো হস্তক্ষেপ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
গত মাসে উয়েফা ইনফান্তিনোর কাছে ৪২টি প্রশ্ন পাঠায়। এতে ফিফা প্রশাসসেনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে উয়েফা। বিশ্বকাপ চলাকালীন, আগের ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়ার পরও ফিফা ফোলারিন বালোগুনকে খেলার অনুমতি দিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর কাছে তদবির করেছিলেন যেন এই মার্কিন ফরোয়ার্ডের ওপর বাধ্যতামূলক এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না করা হয়।
এদিকে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে একজন প্রার্থী সামনে এসেছেন। ফিফা কাউন্সিলের অভিজ্ঞ সদস্য কোহজো তাশিমা বিশ্বকাপে ‘অগ্রহণযোগ্য’ রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। জাপান জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় তাশিমা এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, আমি বেশ লজ্জিত বোধ করেছি। আমরা দেখেছি মাঠের ভেতরে বিষয়গুলো কারসাজির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
গত মাসে জানা যায়, মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্লে-অফের আগেই ফিফা জানত যে কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি অযোগ্য ছিলেন, অথচ তিনি এর আগের চারটি বাছাইপর্বের ম্যাচে খেলেছিলেন। ফিফা অতীতে অনুরূপ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে ম্যাচগুলোতে পরাজিত ঘোষণা (ডিফল্ট) করলেও, কঙ্গোর ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। এর ফলে বুরকিনা ফাসো এবং নাইজেরিয়া পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
বিশ্বকাপের আগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে ফিফা এক আশ্চর্যজনক সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলে টুর্নামেন্টে তাকে অন্তত এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া হয়। বাছাইপর্বের ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়ার অপরাধে তাকে নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে কেবল একটি ‘পরীক্ষামূলক শাস্তি’ (প্রবেশনারি সেন্টেন্স) দেওয়া হয়েছিল। ফিফার এক বিবৃতিতে মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রোম গার্সিয়াকে তার অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
গ্রাফস্ট্রোম বলেন, তার প্রচেষ্টার ফলে ফুটবল খেলাটি আরও ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে। আমরা তার পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য তাকে শুভকামনা জানাই। গার্সিয়া সুইজারল্যান্ডের লোজানে অবস্থিত ‘কোর্ট অফ আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট’-এর ব্যবস্থাপনা বোর্ডেও দায়িত্ব পালন করছেন। এই আদালত প্রতি বছর ক্লাব, খেলোয়াড় এবং কোচদের মধ্যকার চুক্তিভিত্তিক বিরোধ সংক্রান্ত ফিফার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আসা শত শত আপিল নিষ্পত্তি করে থাকে।
ফিফা জানিয়েছে, জুরিখভিত্তিক তাদের ফুটবল বিষয়ক নিয়মকানুন বিভাগের প্রধান ইয়ান ক্লাইনার মায়ামিতে অবস্থিত আইনি ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।











