বিশেষ প্রতিবেদকঃ বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাপড় আমদানি করে তা দিয়ে পোশাক তৈরি ও বিদেশে রপ্তানি করার কথা। কিন্তু সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাপড় খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের বিরুদ্ধে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) পরিচালিত অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ৯৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকির তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মো. লিটন আলীর মালিকানাধীন রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড ৪১টি ইউটিলাইজেশন পারমিশন (ইউপি) বা ইউপির আওতায় বন্ড সুবিধায় মোট ২ হাজার ৮৬২ টন ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় আমদানি করে। এসব কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করার কথা থাকলেও বাস্তবে তার বড় একটি অংশের কোনো বৈধ হিসাব পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আমদানি করা কাপড়ের মধ্যে ২ হাজার ২৩৭ টনই রাজধানীর ইসলামপুরের খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিআইসির পর্যালোচনায় আমদানি ও রপ্তানির হিসাবেও বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় সুতা ও নিট কাপড় আমদানি এবং রপ্তানির যে হিসাব দেখিয়েছে, তার সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্য পাওয়া গেলেও ওভেন পলিয়েস্টার কাপড়ের ক্ষেত্রে আমদানির পরিমাণের সঙ্গে রপ্তানির কোনো মিল পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, যে পরিমাণ কাপড় আমদানি করা হয়েছে, তার বিপরীতে পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানির যথাযথ তথ্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির ৪১টি ইউপির মধ্যে ৩১টির বিপরীতে কোনো রপ্তানির তথ্য নেই। এর মধ্যে ৩০টি এন্ট্রিতে আমদানি করা কাপড়ের সম্পূর্ণ পরিমাণই অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি আরও ১০টি এন্ট্রিতে আংশিকভাবে কাপড় সরানোর তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে এসব এন্ট্রিতে আমদানি করা কাপড়ের প্রায় ৫৩ শতাংশের হিসাব মেলেনি। বন্ড সুবিধায় আনা কাপড় নির্ধারিত কাজে ব্যবহার না করে বাইরে বিক্রি করার মাধ্যমে শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগের অপব্যবহার করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
আমদানি কার্যক্রমের সময়কাল বিশ্লেষণ করেও সন্দেহজনক তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা বিভাগ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের শুরুর সময় পর্যন্ত ৪১টি ইউপির আওতায় আমদানি করা মোট কাপড়ের প্রায় ৮২ শতাংশই আনা হয়েছে। অথচ গত এক মাসে এসব কাপড় ব্যবহার করে কোনো পোশাক উৎপাদন বা রপ্তানির তথ্য পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসেই প্রায় ৩৯০ টন কাপড় আমদানি করা হলেও সেই কাপড় দিয়ে তৈরি পোশাকের রপ্তানির কোনো তথ্য মেলেনি। ফলে আমদানি করা কাপড়ের প্রকৃত ব্যবহার এবং সেগুলো কোথায় সরবরাহ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সিআইসির হিসাব অনুযায়ী, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১৩৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এসব কাপড়ের বিপরীতে প্রযোজ্য শুল্ক ও করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকা। অর্থাৎ, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকার এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত আমদানি করা পণ্য নির্ধারিত রপ্তানিমুখী উৎপাদনে ব্যবহার না করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হলে তা শুল্ক আইন ও বন্ড ব্যবস্থাপনার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ ঘটনায় বন্ড ব্যবস্থাপনার তদারকি এবং আমদানি করা পণ্যের প্রকৃত ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কীভাবে বিপুল পরিমাণ কাপড় আমদানি করে তার বড় অংশ খোলাবাজারে বিক্রি করা হলো, সংশ্লিষ্ট ইউপিগুলোর বিপরীতে কী ধরনের নজরদারি ছিল এবং রপ্তানির হিসাব যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল জানিয়েছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার এবং রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে অসাধু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তবে রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লিটন আলীর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।










