কমলাপুর কাস্টম হাউসে মঈনুল-সুমি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ, ১১ মাসে ৫১ হাজার টন শিট খালাস নিয়ে প্রশ্ন

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরে পণ্য খালাস ও রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রভাবশালী একটি চক্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মঈনুল হোসেন এবং কাস্টম হাউসের সাবেক আনস্টাফিং কর্মকর্তা, বর্তমানে উপকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খাদিজা পারভীন সুমি। অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার, পদায়ন ও বদলি নিয়ে চাপ সৃষ্টি এবং ঘোষণার ভিত্তিতে পণ্য খালাসের সুযোগ তৈরি করে চক্রটি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির সুবিধা নিয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট নথি, চালান, মূল্যায়ন ও খালাস-সংক্রান্ত রেকর্ড পর্যালোচনা এবং অভিযুক্তদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা মঈনুল হোসেন কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত হন ‘কাস্টমস সরকার’ হিসেবে। পরে অন্যের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায় যুক্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালে কমলাপুর কাস্টম হাউসে শিট খালাসের কাজ শুরু করার পর তার ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

বর্তমানে ‘পারভীন ট্রেডার্স’ ও ‘মা অ্যাসোসিয়েট’ নামের দুটি সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সের মাধ্যমে শিট আমদানির বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করে মঈনুল তার পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা আদায় করেছেন।

১১ মাসে প্রায় ৫১ হাজার টন শিট খালাসের দাবি

অনুসন্ধানে পাওয়া নথির বরাতে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, খাদিজা পারভীন সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকা প্রায় ১১ মাসে মঈনুল হোসেনের পারভীন ট্রেডার্স থেকে প্রায় ৫১ হাজার টন শিট খালাস হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ হাজার টন ছিল তুলনামূলক কম শুল্কের এইচআর ও সিআর শিট বলে দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু চালানে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তবে আমদানি করা পণ্যের মিল ছিল না। বিশেষ করে উচ্চ শুল্কের পণ্যকে কম শুল্কের পণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন।

তাদের আরও অভিযোগ, এসব চালানের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী কায়িক পরীক্ষা না হওয়ায় প্রকৃত পণ্য ও ঘোষিত পণ্যের পার্থক্য শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়নি। এতে প্রতি টনে কয়েক হাজার টাকা করে রাজস্ব ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

তবে মোট রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ কত, তা নির্ধারণে প্রতিটি চালানের বিল অব এন্ট্রি, ঘোষণাপত্র, পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, মূল্যায়ন ও শুল্ক পরিশোধের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় মঈনুলের কোনো চালানই যথাযথভাবে খুলে পরীক্ষা করা হয়নি। তার পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া তদারকিতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কামরুল ও শাহ আলম ভূমিকা রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নতুন কর্মকর্তা আসতেই ধরা পড়ে সাত চালান

পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে খাদিজা পারভীন সুমিকে আনস্টাফিং দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ৪০ ব্যাচের সহকারী কমিশনার আসিফ আহমেদ অনিককে দায়িত্ব দেওয়ার পর—এমন দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর।

নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঈনুল হোসেনের পারভীন ট্রেডার্সের কয়েকটি চালানে তল্লাশি চালান বলে জানা গেছে। সূত্রগুলোর দাবি, সাতটি চালানে ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরে কমিশনারের মাধ্যমে এসব ঘটনায় প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এই ঘটনাকে ঘিরেই প্রশ্ন উঠেছে, একই ধরনের চালান এর আগে কীভাবে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাইরে থেকে খালাস হয়েছে।

বদলির চাপের অভিযোগ

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের দাবি করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সহকারী কমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার পর কম শুল্কের এইচআর ও সিআর শিটের খালাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একই সময়ে উচ্চ শুল্কের জিপি শিট হিসেবে খালাসের হার বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছায় বলে দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নিয়ম মেনে কাজ শুরু করার এক সপ্তাহের মধ্যেই ওই কর্মকর্তাকে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে সেখানে ৪১ ব্যাচের আরেক কর্মকর্তা সামিয়া তাইছিরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এই বদলিকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, অনিয়ম শনাক্ত করার পরই যদি কোনো কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কাস্টমসের আইন প্রয়োগ ও রাজস্ব সুরক্ষার কার্যক্রম কতটা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগ

এনবিআর-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ রয়েছে, খাদিজা পারভীন সুমির স্বামী প্রশাসন ক্যাডারের ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। অভিযোগকারীদের দাবি, এই প্রশাসনিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে সুমি কাস্টমসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন।

আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও শিটের ‘অ্যাসেসমেন্ট গ্রুপ’-সংক্রান্ত দায়িত্বে তার প্রভাব এখনও রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে কোনো কর্মকর্তার স্বামী বা পরিবারের সদস্যের সরকারি পদমর্যাদা নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। অভিযোগটি যাচাই করতে হলে পদায়ন, দায়িত্ব বণ্টন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট চালানের নথিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ছুটির দিনে ৮২০ টন শিট খালাসের অভিযোগ

কমলাপুর কাস্টম হাউসের কার্যক্রম নিয়ে আরও কিছু প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, শুল্ক ফাঁকি নিয়ে কাজ করায় সিআইসির এক উপপরিচালককে কুমিল্লায় বদলি করা হয়েছিল। তবে এ সংক্রান্ত কোনো আদেশ বা নথি প্রকাশ্যে না থাকায় বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া সাবেক এক কমিশনারের বিদায়ের পর সরকারি ছুটির দিনে মাত্র দুই ঘণ্টায় প্রায় ৮২০ টন শিট খালাসের অভিযোগও উঠেছে। এত বিপুল পরিমাণ পণ্য অল্প সময়ে কীভাবে খালাস হলো, ওই সময়ে দায়িত্বে কারা ছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট চালানগুলোতে কী ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নথিপত্র পর্যালোচনা জরুরি।

রাজস্ব সুরক্ষায় জবাবদিহি জরুরি

কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরে যদি ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও নিয়মিতভাবে চালান খালাস হয়ে থাকে, তাহলে এর সঙ্গে শুধু কোনো সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নয়, সংশ্লিষ্ট পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বিশেষ করে ১১ মাসে প্রায় ৫১ হাজার টন পণ্য খালাসের দাবি, সাতটি চালানে ঘোষণার অসঙ্গতি শনাক্ত হওয়ার পর প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়গুলো পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

একই সঙ্গে প্রতিটি চালানের বিল অব এন্ট্রি, পণ্য পরীক্ষার রেকর্ড, অ্যাসেসমেন্ট নথি, শুল্ক পরিশোধের হিসাব, আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত এবং বদলি-পদায়নের আদেশ পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগগুলোর ভিত্তি যাচাই করা সম্ভব হবে।

অভিযোগের বিষয়ে মঈনুল হোসেন, খাদিজা পারভীন সুমি এবং সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু রাজস্ব ক্ষতির বিষয় নয়, বরং কাস্টমসের পণ্য খালাস ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার ওপরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।

  • Related Posts

    বন্ড কমিশনারেটে ৭০–৮০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ: কাস্টমস কর্মকর্তা রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে ঘুষ, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী কমিশনার রাসেল আল মামুনকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগ…

    বিআইডব্লিউটিএর মেগা প্রকল্পে পাইলিং কেলেঙ্কারির অভিযোগ: ৫০০ মিমির বদলে ৩০০, ৪০.৫০ মিটারের স্থলে ২৩ মিটার—১০ রডের জায়গায় ৭, নকশা বদলে কোটি টাকা আত্মসাতের দাবি

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) একটি বড় প্রকল্পের পাইলিং কাজে অনুমোদিত নকশা ও নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন মানা হয়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে পাইলের ব্যাস ও দৈর্ঘ্য কমানো এবং…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি ১ নভেম্বর

    • By admin admon
    • অক্টোবর ৭, ২০২৬
    • 0 views
    শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি ১ নভেম্বর

    ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৮১ সামরিক বিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

    • By admin admon
    • অক্টোবর ৭, ২০২৬
    • 1 views
    ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৮১ সামরিক বিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

    এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কেনার ঐতিহাসিক চুক্তি আজ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ৭, ২০২৬
    • 7 views
    এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কেনার ঐতিহাসিক চুক্তি আজ

    বন্ড কমিশনারেটে ৭০–৮০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ: কাস্টমস কর্মকর্তা রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে ঘুষ, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ৭, ২০২৬
    • 16 views
    বন্ড কমিশনারেটে ৭০–৮০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ: কাস্টমস কর্মকর্তা রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে ঘুষ, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

    দুদকের ৩ উপপরিচালক ও ৯ সহকারী পরিচালক পদে রদবদল

    • By admin admon
    • অক্টোবর ৭, ২০২৬
    • 5 views
    দুদকের ৩ উপপরিচালক ও ৯ সহকারী পরিচালক পদে রদবদল

    যেসব অঞ্চলে টানা চার দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি

    • By admin admon
    • অক্টোবর ৭, ২০২৬
    • 7 views
    যেসব অঞ্চলে টানা চার দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি