বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকার গুলশান এলাকায় অবস্থিত কানাডিয়ান ট্রিলিনিয়াম স্কুল ও এর সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পাসগুলোকে ঘিরে সম্প্রতি নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। স্কুলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান পিয়ালের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বর্তমান ও সাবেক কিছু শিক্ষক-কর্মকর্তা। এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং বিভিন্ন অনিয়মের খবর চাপা দিতে পিয়াল প্রভাব খাটানোর পাশাপাশি কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে সাংবাদিক ও স্কুলের সাবেক-বর্তমান কর্মীদের হুমকি দিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাহমুদুল হাসান বাদল নামের এক ব্যক্তি পিয়ালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের ফোন করে দেখা করতে বলেন এবং সেখানে গিয়ে সাংবাদিকরা নানাভাবে ভয়ভীতি ও চাপের মুখে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বলেন যে স্কুলের এমডির বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধু সাংবাদিকরাই নন, স্কুলের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা ও শিক্ষকও একই ধরনের হুমকির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন।
স্কুলের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন অনেক কর্মী। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মী নারী হলেও তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করার মতো পরিবেশ নেই। কিছু কর্মীর দাবি, নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতার চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও অন্য বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, যারা এমডির ব্যক্তিগত ইচ্ছার সঙ্গে সায় দেন তাদের পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি হয়, আর যারা এতে রাজি হন না তারা মানসিক চাপ ও অপমানের মুখে পড়েন কিংবা একসময় চাকরি হারান।
স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মরত পাকিস্তানি নাগরিক আয়েশাকে ঘিরেও নানা প্রশ্ন তুলেছেন কিছু কর্মী। তাদের বক্তব্য, তিনি প্রথমে শিক্ষক সহকারী হিসেবে যোগ দিলেও পরে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে ভাইস প্রিন্সিপাল হন। কিছু কর্মীর দাবি, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং এমডি মাহমুদুর রহমান পিয়ালের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কারণেই এই পদোন্নতি হয়েছে বলে তারা সন্দেহ করেন। একইভাবে আয়েশার স্বামী জিয়াকেও স্কুলে রিক্রুট ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যদিও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক।
এছাড়া স্কুলের ভেতরে আরও কয়েকজন নারী কর্মকর্তা—শুভ্রা সরকার, অবন্তী ও রিফাত—নিয়ে নানা অভিযোগ করেছেন কিছু কর্মী। তাদের দাবি, এই ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করে অন্য শিক্ষিকাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে এমডির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতে বিভিন্নভাবে প্ররোচনা দেন। অনেক নারী শিক্ষক নাকি এই পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একজন নারী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কর্মক্ষেত্রে সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেকেই ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন। তার দাবি, কোনো নারী কর্মী যদি এমডির ব্যক্তিগত প্রস্তাবে রাজি না হন, তাহলে তাকে নানাভাবে অপমান করা হয় বা চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
আরেকটি অভিযোগে বলা হয়েছে, সম্প্রতি কিছু শিক্ষক ও কর্মকর্তাকে নিয়ে কক্সবাজারে একটি ভ্রমণের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে এমডি মাহমুদুর রহমান পিয়াল, আয়েশা, অবন্তী, রিফাতসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। এ নিয়েও কর্মীদের মধ্যে নানা আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরও কিছু প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে আয়কর ও ভ্যাট সংক্রান্ত অনিয়ম, যথাযথ অনুমোদন ছাড়া বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া কিছু ক্যাম্পাস পরিচালনার বিষয়। এসব অভিযোগের পাশাপাশি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নারী শিক্ষক তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পোস্ট দিলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সেখানে তিনি দাবি করেন, এইচআর ম্যানেজার শুভ্রা সরকার তাকে একদিন এমডির বাসায় নিয়ে যান এবং পরে একা রেখে চলে গেলে তিনি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন।
স্কুলের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তা মনে করেন, এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্নভাবে শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু ভয় ও প্রভাবের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে বলতে সাহস পাননি। তারা এখন বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
অভিযোগের সত্যতা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্তৃপক্ষের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।











