এসএম বদরুল আলমঃ চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার কথা শোনা যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন তথ্য, নথি এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি আগের ধারণার চেয়েও অনেক বড় ও জটিল। এখানে শুধু শ্রমিক রাজনীতি নয়, বরং কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন স্তরের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক কাজ করছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।
এই আলোচনার কেন্দ্রে যাদের নাম ঘুরে ফিরে আসছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সিবিএ সংশ্লিষ্ট নেতা নায়েবুল ইসলাম ফটিক, শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ইব্রাহিম খোকন ও শেখ নূরুল্লাহ বাহার। এছাড়া পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম, শিপিং শাখার প্রধান সহকারী রফিকুল ইসলাম সেতু, প্রশাসনিক কর্মচারী আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং প্রধান সহকারী সরোয়ার হোসেন লাভলুর নামও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নায়েবুল ইসলাম ফটিককে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে তার তথাকথিত ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ’ নিয়ে। অভিযোগ আছে, দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকলেও তার প্রভাব কমেনি। বরং তার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে বন্দরের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে তার প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্তেও তার মতামত কার্যকর হয়েছে বলে দাবি করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
অন্যদিকে, ইব্রাহিম খোকন ও শেখ নূরুল্লাহ বাহারকে ঘিরে শ্রমিক রাজনীতির আড়ালে প্রভাব বলয় তৈরির অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, তারা শুধু শ্রমিক সংগঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন, বরং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও প্রভাব খাটাচ্ছেন। কমিশন বাণিজ্য, সুবিধা আদায় এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুযোগ করে দেওয়ার মতো অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে।
পরিচালক পর্যায়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাত দেখান, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সুবিধা দেন এবং কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। যদিও এসব বিষয় নিয়ে তার পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
শিপিং শাখা ও প্রশাসনিক স্তরেও অনিয়মের অভিযোগ কম নয়। রফিকুল ইসলাম সেতু, আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং সরোয়ার হোসেন লাভলুর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, তথ্য ফাঁস এবং প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার। দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ থাকলেও দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায় না।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইস্যুতেও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যক্তি একদিকে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন, আবার অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এতে আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
এর পাশাপাশি কয়েকজনের বিরুদ্ধে আয়ের উৎসের সঙ্গে মিল না থাকা সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। একাধিক স্থানে সম্পত্তি, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব এবং অস্বচ্ছ আর্থিক লেনদেন নিয়ে আলোচনা চলছে। জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৪ সালে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তলব করে তাদের সম্পদের হিসাব চেয়েছিল এবং একটি প্রাথমিক অনুসন্ধানও শুরু হয়। তবে সেই তদন্তের অগ্রগতি এখনো পরিষ্কার নয়।
সব মিলিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এত অভিযোগ থাকার পরও কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়? অনুপস্থিত কর্মচারী এখনও বহাল, বিতর্কিত বদলি কার্যকর হয়নি, অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে দায়িত্বে রয়েছেন। এতে করে বন্দর প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই এখানে যদি সত্যিই এমন একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় থাকে, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়—পুরো জাতীয় অর্থনীতির জন্যই উদ্বেগজনক। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।











