এসএম বদরুল আলমঃ জাতীয় সংসদের নতুন অধিবেশনের শুরুতেই বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন স্পিকারের বক্তব্য চলাকালে হঠাৎ করেই মূল সাউন্ড সিস্টেম বিকল হয়ে যায়। নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বারবার চেষ্টা করেও মাইক্রোফোন চালু করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে বাধ্য হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অধিবেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয় এবং পরে আবার তা শুরু করা হয়। এই ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঘটনার পেছনে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম, আলো ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি উন্নয়নের জন্য প্রথমে প্রায় ২৩ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হলেও পরে তা কমিয়ে ১২ কোটি টাকায় অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পে বিদেশি বিশেষজ্ঞ লারস ভিডেক্যামকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি পুরো সিস্টেম বদল না করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ মেরামত করার পরামর্শ দিলেও তা গুরুত্ব পায়নি।
পরবর্তীতে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন স্থাপন করা হয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এসব যন্ত্রপাতি ঠিকমতো বসানো হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনভিজ্ঞ ঠিকাদার দিয়ে কাজ করানোর কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই যন্ত্রপাতি পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যা রাষ্ট্রের আরও অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
এই প্রকল্পে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ‘আমানত এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ঢাকা গণপূর্ত ইএম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেনের নাম উঠে এসেছে। এছাড়া প্রকল্প তদারকির সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলী আসিফুর রহমান ও সামসুল ইসলামকেও দায়ী করা হচ্ছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আগেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল বলে জানা গেছে। তিনি পূর্বে দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পের নিয়ম ভেঙে নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এমনকি তার কর্মকাণ্ডের কারণে একাধিকবার তদন্তও হয়েছে এবং তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল। তবে পরে তিনি আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসেন, যেখানে আশ্রাফুল হকের সহায়তার কথাও শোনা যাচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সাউন্ড সিস্টেমের তার বা কেবল নিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় উচ্চমানের কেবল ব্যবহার করা জরুরি। কিন্তু এখানে নিম্নমানের কেবল ব্যবহার করা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তার জোড়া দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সাউন্ড সিস্টেমে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আরও অভিযোগ আছে, ব্যবহৃত কেবলগুলোর কোনো মান যাচাই বা পরীক্ষার প্রমাণও নেই।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গণমাধ্যমে দাবি করছেন, তারা আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছেন এবং তাদের কোনো গাফিলতি নেই। তবে সমালোচকদের মতে, হেডফোন বা মাইক্রোফোনের বিষয়টি সামনে এনে মূল সমস্যাটি আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এই ঘটনায় শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং পরিকল্পনা, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। এখন সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আর না ঘটে।











