চট্টগ্রাম বন্দরে বদলি হয়েও প্রভাবশালী ক্যাপ্টেন ফরিদের বিরুদ্ধে ফের দুর্নীতির অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

চট্টগ্রাম প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা উপ-সংরক্ষক ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে আবারও গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বদলি হয়েও এখনো চট্টগ্রাম বন্দরে প্রভাব খাটাচ্ছেন এবং নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন।

কয়েক মাস আগে দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বদলি করে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে পাঠায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। বর্তমানে তিনি পায়রা বন্দরে পরিচালক (ট্রাফিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে নতুন করে প্রায় ৪ কোটি টাকার বিল তোলার চেষ্টা এবং বন্দরে ফেরার জন্য তদবির করার অভিযোগে ফের আলোচনায় এসেছেন এই কর্মকর্তা।

চট্টগ্রাম বন্দরের নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, বন্দরের টাগবোট ‘এমটি কাণ্ডারি-৮’-এর মেরামত, পাইপিং, আন্ডারওয়াটার ওয়ার্ক ও পেইন্টিংসহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে ক্যাপ্টেন ফরিদ তার পছন্দের ঠিকাদার মাহি এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ দেন। মাত্র আট দিনের মধ্যে বিশাল কাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে তিনি বিল পরিশোধের সুপারিশও করেন।

২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি পরিদর্শন কমিটির পক্ষ থেকে রিপোর্ট দেন যে কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং মালামাল গ্রহণের সুপারিশ করেন। বাকি সদস্যরাও সেই প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন—এত বড় কাজ কীভাবে মাত্র আট দিনে শেষ হলো? তদন্তে দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম হয়েছে এবং প্রক্রিয়া না মেনে বিল উত্তোলনের চেষ্টা চলছিল।

এর পরই বন্দর কর্তৃপক্ষ ২৭ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠিয়ে ক্যাপ্টেন ফরিদকে অন্যত্র বদলির সুপারিশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানান অনিয়মে জড়িত এবং চট্টগ্রাম বন্দরে তার উপস্থিতি প্রশাসনিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বদলি হলেও তিনি বাইরের লোকজনের মাধ্যমে এখনো বন্দরের বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এমনকি তাকে সদস্য (অর্থ) পদে বসানোর জন্য নানা মহলে তদবিরও চালাচ্ছেন। এতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

এই প্রথম নয়—ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ২০১৩ সালে ইন্দোনেশিয়ান জাহাজ ‘এমভি গ্লেডিস’ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি তাকে দায়ী করে। এছাড়া ২০১১ সালের ভিটিএমএস প্রকল্পে (Vessel Traffic Management System) নিয়ম ভেঙে ২ কোটি টাকার বেশি বিল আগাম পরিশোধের অভিযোগও প্রমাণিত হয়। সে সময় তাকে স্বেচ্ছাচারী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে আখ্যা দিয়ে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছিল।

সব অভিযোগ সত্ত্বেও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন—এ বিষয়টি নিয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম বন্দরের অনেক কর্মকর্তা।

বিষয়টি জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, “ক্যাপ্টেন ফরিদের বদলি ও পদোন্নতির বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আমরা এখান থেকে কিছু করতে পারব না। টাগবোটের বিষয়েও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”

অন্যদিকে, ক্যাপ্টেন ফরিদ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, “সব কাজ নিয়ম মেনেই হয়েছে। আমার একক সিদ্ধান্তে কিছু হয়নি। বন্দর কর্তৃপক্ষের ৯০ শতাংশ কাজই এমনভাবে হয়।”

কাজটি মাত্র ৮ দিনে শেষ করার প্রশ্নে তিনি বলেন, “এই কাজ আসলে আগেই শুরু হয়েছিল। তদন্ত কমিটি আমার বিরুদ্ধে কিছুই পায়নি।” তবে কেন তাকে বদলি করা হলো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাকে কেন জড়ানো হচ্ছে জানি না। আমি আমার জবাব দিয়েছি। হয়তো কাউকে দোষী দেখাতে আমাকে টানা হয়েছে।”

তিনি আরও দাবি করেন, “আমি প্রমোশন চেয়েছি, এটা অপরাধ নয়। আমার আগের সাতজন একই পদ থেকে পদোন্নতি পেয়েছেন।”

তবে বন্দরে বাইরের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তিনি স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন।

বন্দর সূত্র বলছে, ক্যাপ্টেন ফরিদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগগুলো এখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনাধীন আছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, তার মতো বিতর্কিত কর্মকর্তাকে দীর্ঘদিন ধরে কোনো না কোনোভাবে রক্ষা করা হচ্ছে—যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর বার্তা দিচ্ছে।

  • Related Posts

    গেজেটের নীতিমালা পাশ কাটিয়ে ‘লটারিতে’ বদলি-পদায়ন, প্রশ্নের মুখে গণপূর্তের সিদ্ধান্ত

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, সম্প্রতি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যেসব বদলি-পদায়ন করা হয়েছে, তার কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যমান সরকারি…

    ১০ হাজার টাকার বেতন, ৪ কোটি টাকার প্রাসাদ: ফরিদপুর গণপূর্তের ক্যাশিয়ার জাহাঙ্গীরের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় মূল বেতন ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। পদটি উচ্চমান হিসাব সহকারী, গ্রেড ১৪। প্রায় দুই দশকের চাকরিজীবনে বেতন-ভাতা থেকে অর্জিত বৈধ আয়ের সঙ্গে…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্প, কাঁপলো ইকুয়েডরও

    • By Sara
    • আগস্ট ১০, ২০২৬
    • 0 views
    কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্প, কাঁপলো ইকুয়েডরও

    সাতক্ষীরায় চাঁদাবাজির মামলায় কারাগারে জামায়াত নেতা হাজী নজরুল ইসলাম

    • By Sara
    • আগস্ট ১০, ২০২৬
    • 1 views
    সাতক্ষীরায় চাঁদাবাজির মামলায় কারাগারে জামায়াত নেতা হাজী নজরুল ইসলাম

    নাহিদ বর্তমানে বিশ্ব ক্রিকেটে ‘বড় হুমকি’: তাসকিন

    • By Sara
    • আগস্ট ১০, ২০২৬
    • 1 views
    নাহিদ বর্তমানে বিশ্ব ক্রিকেটে ‘বড় হুমকি’: তাসকিন

    মালয়েশিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ এইচপি

    • By Sara
    • আগস্ট ১০, ২০২৬
    • 1 views
    মালয়েশিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ এইচপি

    ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি হয় সামিরা-আজিজের: দাবি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর

    • By Sara
    • আগস্ট ১০, ২০২৬
    • 2 views
    ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি হয় সামিরা-আজিজের: দাবি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর

    ঢাকায় বাড়তি চাপ কমাতে বাড়বে ঢাকামুখী কমিউটার ট্রেন

    • By admin admon
    • আগস্ট ১০, ২০২৬
    • 6 views
    ঢাকায় বাড়তি চাপ কমাতে বাড়বে ঢাকামুখী কমিউটার ট্রেন