গণপূর্তের ইএম কারখানা বিভাগে অনিয়মের অভিযোগ: সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ইউসুফকে ঘিরে দুদক ও মন্ত্রণালয়ের তদন্ত

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম (ইলেকট্রোমেকানিক্যাল) কারখানা বিভাগের সদ্য সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফকে ঘিরে কমিশন বাণিজ্য, ঠিকাদার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে দাখিল করা লিখিত অভিযোগ, ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ বণ্টন, বিল ছাড়ে কমিশন আদায় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। অভিযোগের পর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তদন্তের নির্দেশ দেয় এবং বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এও জমা পড়েছে।

অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দায়িত্ব পালনকালে মো. ইউসুফ নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকতেন না। ঠিকাদার ও সেবাপ্রত্যাশীরা প্রায়ই তাকে অফিসে কিংবা মোবাইল ফোনে পেতেন না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও বিল দীর্ঘদিন আটকে থাকত বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, কোনো কাজের বিল ছাড় করতে হলে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হতো। কমিশন না দিলে মাসের পর মাস বিল আটকে রাখা হতো। অভিযোগ রয়েছে, আগারগাঁওয়ের একটি সরকারি প্রকল্পে বিল ছাড়ের জন্য এক ঠিকাদারের কাছ থেকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. ইউসুফের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ঠিকাদার—বিশেষ করে বিহারী কাওসার ও নাজমা এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে অধিকাংশ কাজ নিয়ন্ত্রিত হতো। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিল, কাজ সম্পন্ন না করেই অর্থ ছাড় এবং সাধারণ ঠিকাদারদের বঞ্চিত করার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ইএম কারখানা বিভাগে পদায়ন ও বদলিকে কেন্দ্র করেও অর্থ লেনদেনের একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, মো. ইউসুফ নিজেও এ বিভাগে পদায়নের জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন এবং পরে বিভিন্ন কমিশন ও অনিয়মের মাধ্যমে সেই অর্থ তুলে নেন।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, নিজের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে তিনি ভুয়া প্যাড ও সিল ব্যবহার করে নিজেকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক নেতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট নথিতে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন না করেই বিল পরিশোধ, নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি গণপূর্ত কারখানা উপবিভাগ-২-এর তিনটি পুরোনো ট্রান্সফরমার নিলামে বিক্রির ক্ষেত্রেও সরকারি কোষাগারে কম অর্থ জমা দেখিয়ে কমিশন গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংসদ সচিবালয়ের ১১২ ফ্ল্যাট প্রকল্পে পাম্প মোটর ও সিসিটিভি স্থাপনের কোটি টাকার দুটি চুক্তির সম্পূর্ণ বিল জুন ক্লোজিংয়ের আগেই পরিশোধ করা হলেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি সেই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে। একই অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, জাতীয় আর্কাইভ ও লাইব্রেরি এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক কাজেও নামমাত্র কাজ করে বা নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব কাজে উপসহকারী প্রকৌশলী মিল্টন কুমার দাস নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। তার বিরুদ্ধে একই মালামাল একাধিক প্রকল্পে দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এছাড়া পিএসসি প্রিন্টিং প্রেস, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বন অধিদপ্তর, এনবিআর, বিটিআরসি, স্পারসো, বিআইসিসি, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও আবাসন প্রকল্পসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক, লিফট ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজেও অতিরিক্ত বিল ও অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে।

লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া বিল, ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়া এবং বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে মো. ইউসুফ বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার নামে-বেনামে বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়ি, ব্যাংক হিসাবসহ বিপুল সম্পদ, অর্থ পাচার এবং কর ফাঁকির অভিযোগও দুদকে জমা পড়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযোগের ভিত্তিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। তবে তদন্তের অগ্রগতি বা ফলাফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িত থাকলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকা এবং গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দেওয়া উচিত।

অভিযোগের বিষয়ে মো. ইউসুফের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে কল ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। তার কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

  • Related Posts

    দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যেই এলজিইডির পিডি আতিকুল, সম্পদ ও অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আতিকুল ইসলামকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। বরিশালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে…

    কোটি টাকার মাসোহারা থেকে সম্পদের পাহাড়—উত্তর বন্ডে মাসুম-হাসনাইন চক্রের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ফাইল আটকে অর্থ আদায়, বন্ড সুবিধায় অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থাপনার অন্যতম কেন্দ্র বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)। সেই প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, বন্ড সুবিধার অনিয়ম এবং অবৈধ…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    কার পেনশন কত বাড়বে

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬
    • 3 views
    কার পেনশন কত বাড়বে

    সারা দেশে দমকা হাওয়া-বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা

    সারা দেশে দমকা হাওয়া-বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা

    দিল্লিতে ছয়তলা ভবন ধসে নিহত ৬, ধ্বংসস্তূপে আটকা বহু মানুষ

    দিল্লিতে ছয়তলা ভবন ধসে নিহত ৬, ধ্বংসস্তূপে আটকা বহু মানুষ

    সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিক: বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী

    • By Sara
    • সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
    • 7 views
    সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিক: বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী

    হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ, শিগগিরই ‘রেস্ট্রিক্টেড জোন’ ঘোষণা করবে ইরান

    • By Sara
    • সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
    • 6 views
    হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ, শিগগিরই ‘রেস্ট্রিক্টেড জোন’ ঘোষণা করবে ইরান

    বন্ধ হলো কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট, কমেছে হ্রদের পানির উচ্চতা

    • By Sara
    • সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
    • 8 views
    বন্ধ হলো কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট, কমেছে হ্রদের পানির উচ্চতা