জুন আসে, জুন যায়—কেন বদলান না ‘প্রভাবশালী’ কর্মকর্তারা? গণপূর্ত, বিআরটিএ ও বিআরটিসিতে প্রশ্ন

image_pdfSaveimage_print

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ‘জুন ক্লোজিং পর্যন্ত অপেক্ষা করুন’—সরকারি দপ্তরের অনেক কর্মকর্তার বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে এই কথাটি যেন দীর্ঘদিনের এক অঘোষিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা। তাদের অভিযোগ, জুন আসে, জুন যায়; কিন্তু কিছু কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদে বছরের পর বছর বহাল থাকেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক প্রকৌশলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যখনই ঢাকায় চাকরির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অনুরোধ করি, তখনই বলা হয় জুন ক্লোজিং পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। কিন্তু জুন শেষ হওয়ার পরও আমার আর ঢাকায় কাজ করা হয় না। অথচ কিছু কর্মকর্তা প্রতি জুনেই কোনো না কোনোভাবে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে যাচ্ছেন।”

এমন অভিযোগের তালিকায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানার নামও উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে শেরেবাংলা নগর-৩ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও কয়েক বছর ছিলেন তিনি। অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক এক প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিতি থাকার সময় থেকেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি নিজস্ব প্রভাববলয় তৈরি করে একই ধরনের সুবিধা ধরে রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য জানা প্রয়োজন।

শত শত কোটি টাকার প্রকল্প ও দরপত্র নিয়ে প্রশ্ন : গণপূর্তের একাধিক প্রকৌশলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ডিভিশন-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানা দায়িত্ব পালনকালে কয়েকটি বড় প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ প্রকল্প, প্রায় ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বিএম ভবন এবং একাধিক থানা কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান ও নিষ্পত্তির দায়িত্ব তার অধীন ছিল।

এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তার এখতিয়ারাধীন প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের খণ্ড খণ্ড দরপত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন প্রকৌশলী। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার ফলে প্রশাসনিক ভারসাম্য ও বদলি নীতির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবিরকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড় :
অন্যদিকে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ কবিরকে ঘিরেও নানা অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ধানমন্ডি গণপূর্ত উপবিভাগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় এবং পরবর্তীতে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় শত কোটি টাকার বেশি মূল্যের ভুয়া বিল প্রদানের ঘটনায় তার নাম আলোচনায় আসে। ওই সময়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম ফারুক চৌধুরী বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, রাশেদ কবির বর্তমানে পাবনা গণপূর্ত বিভাগে প্রভাবশালী অবস্থানে থেকে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করছেন এবং তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থায় অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও তদন্ত প্রয়োজন।

বকেয়া বেতন-ভাতা প্রদান নিয়েও প্রশ্ন : নথির বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, সাময়িক বরখাস্ত থাকা এক উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে প্রায় ১৯ লাখ টাকা বকেয়া বেতন-ভাতা প্রদানের ঘটনায় রাশেদ কবিরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, অসদাচরণের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত থাকা দুই উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে পরবর্তীতে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তাদের একজনের আবেদন সুপারিশসহ হিসাব কার্যালয়ে পাঠানোর পর প্রায় ১৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। পরে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ভিত্তিতে অর্থ ফেরতের বিষয়টি সামনে আসে।

টেন্ডার প্রক্রিয়া ও জুন মাসের বিল নিয়ে অভিযোগ : পাবনা গণপূর্ত বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ সময়ে জুন মাসে কয়েকটি বড় অঙ্কের কাজের বিল পরিশোধ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, কিছু কাজ বাস্তবায়নের আগেই অগ্রিম বিল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের টেন্ডার পদ্ধতি নিয়েও আপত্তি তুলেছেন তারা। অভিযোগ করা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতি ব্যবহার করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

রূপপুর গ্রিনসিটি ও মেডিকেল কলেজ প্রকল্পে অভিযোগ : রূপপুর গ্রিনসিটি ও পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পের বিভিন্ন ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল, বৈদ্যুতিক ও অবকাঠামোগত কাজ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার, সিডিউল বহির্ভূত কাজ এবং রক্ষণাবেক্ষণ দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।

এমনকি ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের রিপেয়ারিং দেখিয়ে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও করেছেন তারা।

শুধু গণপূর্ত নয়, প্রশ্ন উঠছে বিআরটিএ ও বিআরটিসির ‘মাসুদ’দের নিয়েও : সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে একই ধরনের প্রশ্ন উঠছে। বিআরটিএ, বিআরটিসি ও গণপূর্ত—এই তিন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন কর্মকর্তার দীর্ঘদিন একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে থাকার বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।

প্রশ্ন উঠছে—প্রশাসনে কি বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত হচ্ছে, নাকি কিছু কর্মকর্তা বিশেষ সুবিধা নিয়ে বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ধরে রাখছেন ? ‘জুন আসে, জুন যায়—কিন্তু মাসুদরা থেকে যায় ঢাকায়’—এমন অভিযোগ এখন অনেক কর্মকর্তার মুখে মুখে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য, সরকারি তদন্ত এবং নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসতে পারে।

  • Related Posts

    ‘মাসুদ তুমি ভালো হয়ে যাও’ থেকে বিআরটিসির মাসোহারা সিন্ডিকেট: দুই প্রতিষ্ঠানের দুই মাসুদকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

    নিজস্ব প্রতিবেদকঃ মাসুদ তুমি ভালো হয়ে যাও’—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল আলোচিত এই বাক্যটি এখনো মানুষের মুখে মুখে। ২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বাংলাদেশ…

    বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং সাম্রাজ্য ঘিরে বিতর্ক: আইয়ুব আলীর বিপুল সম্পদের অভিযোগ, মোস্তাফিজুর রহমানও প্রশ্নের মুখে

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন বিআইডব্লিউটিপি-১ প্রকল্পের পরিচালক আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জন, ড্রেজিং প্রকল্পে অনিয়ম, ঠিকাদারি…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    জুন আসে, জুন যায়—কেন বদলান না ‘প্রভাবশালী’ কর্মকর্তারা? গণপূর্ত, বিআরটিএ ও বিআরটিসিতে প্রশ্ন

    • By admin admon
    • জুলাই ২৬, ২০২৬
    • 5 views
    জুন আসে, জুন যায়—কেন বদলান না ‘প্রভাবশালী’ কর্মকর্তারা? গণপূর্ত, বিআরটিএ ও বিআরটিসিতে প্রশ্ন

    ‘মাসুদ তুমি ভালো হয়ে যাও’ থেকে বিআরটিসির মাসোহারা সিন্ডিকেট: দুই প্রতিষ্ঠানের দুই মাসুদকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

    • By admin admon
    • জুলাই ২৬, ২০২৬
    • 5 views
    ‘মাসুদ তুমি ভালো হয়ে যাও’ থেকে বিআরটিসির মাসোহারা সিন্ডিকেট: দুই প্রতিষ্ঠানের দুই মাসুদকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

    ট্রলের শিকার সেই শিক্ষিকার পাশে সারা দেশের সহকর্মীরা

    • By admin admon
    • জুলাই ২৬, ২০২৬
    • 5 views
    ট্রলের শিকার সেই শিক্ষিকার পাশে সারা দেশের সহকর্মীরা

    এমএফএসের ‘অতিরিক্ত’ সার্ভিস চার্জের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রুল

    • By admin admon
    • জুলাই ২৬, ২০২৬
    • 7 views
    এমএফএসের ‘অতিরিক্ত’ সার্ভিস চার্জের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রুল

    বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ পরিণত হলো নিম্নচাপে, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

    • By admin admon
    • জুলাই ২৬, ২০২৬
    • 8 views
    বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ পরিণত হলো নিম্নচাপে, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

    ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে তথ্য সংগ্রহকারী পদে আবেদনের সময় বাড়ল

    • By admin admon
    • জুলাই ২৬, ২০২৬
    • 6 views
    ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে তথ্য সংগ্রহকারী পদে আবেদনের সময় বাড়ল