বিশেষ প্রতিবেদকঃ ‘আমি মাউশির ডিজির লোক, আমার হাত অনেক লম্বা। নিউজ হোক আর যাই হোক, আমার কিছুই হবে না—আমার বিরুদ্ধে যারা সাংবাদিকদের কাছে তথ্য দিচ্ছে, তাদের দেখে নেব।’
রাজধানীর বাড্ডা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাকিমকে ঘিরে ওঠা এমন বিস্ফোরক অভিযোগ এখন আর শুধু অভিযোগের পর্যায়ে নেই; বিষয়টি গড়িয়েছে আনুষ্ঠানিক তদন্তে। ঘুষ-দুর্নীতি, এমপিও ফাইল আটকে অর্থ আদায়, নিয়োগে অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তার, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং সাংবাদিকদের তথ্যদাতাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইসিপ/SESIP) থেকে জারি করা এক আদেশে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
ফলে বাড্ডা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা নানা অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন।
‘ডিজির লোক’ পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ : গণমাধ্যমে আব্দুল হাকিমকে নিয়ে অভিযোগভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের পর তার বিরুদ্ধে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সামনে আসে।
অভিযোগ রয়েছে, গত ২৮ আগস্ট রাজধানীর রামপুরা একরামুন্নেছা বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষকের কাছে আব্দুল হাকিম নিজেকে মাউশির মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। এমনকি তার বিরুদ্ধে যতই লেখালেখি হোক, তাতে তার কোনো ক্ষতি হবে না বলেও মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ করেন উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষক।
বাংলাদেশ স্কাউটসের রোভার অঞ্চলের ঢাকা জেলা রোভারের আওতাধীন ‘আমরা স্কাউটস গ্রুপ, ঢাকা’-এর ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—বিদ্যালয় ভবনেই বাড্ডা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের অস্থায়ী কার্যালয় রয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। অভিযোগ রয়েছে, একই সময়ে সাংবাদিকদের কাছে তথ্য সরবরাহকারী ব্যক্তিদের ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকিও দেন আব্দুল হাকিম। তবে এসব বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত নয়। আর ঠিক এ কারণেই তদন্ত কমিটির কাছে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, অনুষ্ঠানের ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্যান্য তথ্য যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
‘মুখ খুললেই ক্যারিয়ার শেষ’—শিক্ষকদের মধ্যে আতঙ্ক ? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে বিভাগীয় ব্যবস্থা কিংবা ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত করার ভয় দেখানো হয়। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের পর বাড্ডা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের মধ্যে এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ফলে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বক্তব্য গ্রহণ করলে এ অভিযোগের বাস্তবতা যাচাই করা সম্ভব হবে।
‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’ নির্বাচনেও অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ : প্রতি বছর ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’ ও ‘শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক’ নির্বাচন নিয়েও আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাড্ডা থানা শিক্ষা অফিসের আওতাধীন সাতারকুল উচ্চ বিদ্যালয়, বেরাইদ মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়, ছোলমাইদ স্কুল এন্ড কলেজ, খিলবাড়ির টেক উচ্চ বিদ্যালয় এবং আলতুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের যোগ্য ও দক্ষ প্রধান শিক্ষকদের উপেক্ষা করে পছন্দের ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রামপুরা একরামুন্নেছা বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমানকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পরপর দুইবার ‘শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক’ নির্বাচিত করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অনিয়মের অভিযোগে ওই প্রধান শিক্ষকের এমপিও স্থগিত রয়েছে। যদিও আব্দুল হাকিম এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, মিজানুর রহমান ব্যক্তিগত পছন্দে নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই স্বীকৃতি পেয়েছেন।
সমন্বয় কমিটির অর্থে ‘দুইজনের নিয়ন্ত্রণ’ ?
বাড্ডা থানা শিক্ষা অফিসে গঠিত সমন্বয় কমিটির অর্থ ব্যবস্থাপনাকে ঘিরেও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়ম অনুযায়ী একরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসনেয়ারাকে অর্থ সম্পাদক করা হলেও তিনি কার্যত ছিলেন নামমাত্র। কমিটির আয়-ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল হাকিম এবং তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একরামুন্নেছা বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমানের হাতে ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি মনগড়া ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। আয়-ব্যয়ের হিসাব চাওয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে হোসনেয়ারাকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আব্দুল হাকিম এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, এ ধরনের কোনো কমিটি নিয়ন্ত্রণের বিষয়েই তিনি অবগত নন।
এমপিও ফাইল আটকে ‘নিয়োগের শর্ত’ দেওয়ার অভিযোগ : আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠেছে রাজধানীর ছোলমাইদ স্কুল এন্ড কলেজের মাধ্যমিক শাখার শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির ফাইল নিয়ে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন এমপিও ফাইল আটকে রাখার পর আব্দুল হাকিম শর্ত দেন—তার ঘনিষ্ঠ অফিস সহকারী সোহেল, তার বোন এবং বোনের স্বামীকে নিয়োগ দেওয়া হলে তবেই এমপিও ফাইল ফরওয়ার্ড করা হবে। পরিস্থিতির চাপে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ওই নিয়োগ দিতে বাধ্য হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, সংশ্লিষ্ট সময়ের ইএমআইএস সেলের তথ্য, নিয়োগ পরীক্ষার নথি, ফাইলের গতিবিধি এবং নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করলেই অভিযোগের সত্যতা বেরিয়ে আসতে পারে। তবে আব্দুল হাকিম এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, কোনো নিয়োগ তার একক সিদ্ধান্তে হয় না; মাউশির মহাপরিচালকের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে বিধি অনুযায়ী নিয়োগ সম্পন্ন হয়।
‘ফাইল নড়ে না টাকা ছাড়া’—কল রেকর্ড ঘিরে প্রশ্ন :
অভিযোগের মাত্রা আরও বাড়িয়েছে দুই প্রধান শিক্ষকের কথোপকথনের একটি কল রেকর্ড। ওই কথোপকথনে এক শিক্ষক অপরজনকে বলেন—“এমপিও নিয়ে যে কথা বলতে যায়, তারেই শেষ করে হালায় স্যার… আমার স্কুল থেকে কত লাখ টাকা নিছে স্যার এমপিও’র থেকে। প্রতিটা ফাইল পাঠানোর জন্য স্যার কত টাকা করে এমপিও নেয়!” কথোপকথনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পুরোনো বই সংগ্রহ, অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা দেওয়া, পরে সেগুলো অফিসে জমা নেওয়া এবং বই বিক্রির অর্থের হিসাব না দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়।
‘সেবা নেই টাকা ছাড়া’—প্রায় এক ডজন শিক্ষকের অভিযোগ : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রায় এক ডজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, ইএমআইএস সেলের পাসওয়ার্ড থেকে শুরু করে এমপিও, উচ্চতর স্কেল, বিএড স্কেল কিংবা টাইম স্কেল—কোনো ফাইলই টাকা ছাড়া এগোয় না এনটিআরসিএ কিংবা ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির ফাইল প্রেরণের ক্ষেত্রেও অর্থ দাবির অভিযোগ করেছেন তারা।
কয়েকজন শিক্ষক আরও অভিযোগ করেছেন, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের সভাপতির সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রধান শিক্ষকদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
দুদকে মামলা—দাবি : অভিযোগকারীদের, অস্বীকার আব্দুল হাকিমের
একাধিক শিক্ষক দাবি করেছেন, আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা হয়েছে এবং সেটি চলমান। তবে এ দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আব্দুল হাকিম। তার ভাষ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িত কয়েকজন অসাধু শিক্ষক পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এসব তথ্য ছড়াচ্ছেন।
‘সংবাদ প্রকাশ ব্ল্যাকমেইল’—অভিযুক্ত কর্মকর্তার দাবি :
তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগকে ‘মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন আব্দুল হাকিম। ‘ডিজির লোক’ পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “ডিজি মহোদয় আমাদের সবার অভিভাবক।”
অনুষ্ঠানে কোনো বিতর্কিত বক্তব্য দেননি বলেও দাবি করেন তিনি। তার মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ ও অনুষ্ঠানের ভিডিও রেকর্ড পর্যালোচনা করা যেতে পারে। সংবাদ প্রকাশের বিষয়টিকে তিনি ‘ব্ল্যাকমেইল’ করার চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, বাড্ডা থানার অধীন ১৫টি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের উপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের সম্পাদকের সঙ্গে বসে তিনি অভিযোগগুলোর বিস্তারিত জবাব দিতে প্রস্তুত। নিয়োগের বিষয়ে তার বক্তব্য, কোনো নিয়োগ তার একক সিদ্ধান্তে হয় না। মাউশির মহাপরিচালকের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে বিধি অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
‘শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক’ নির্বাচনের অভিযোগও অস্বীকার করে তিনি বলেন, মো. মিজানুর রহমান মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই স্বীকৃতি পেয়েছেন। সমন্বয় কমিটির অর্থ নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও নাকচ করেছেন তিনি।
‘প্রমাণ ছাড়া সংবাদ হলে আইনগত ব্যবস্থা’ : আব্দুল হাকিম বলেন, প্রমাণ ছাড়া তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশ করা হলে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবেন। তিনি সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের সম্পাদকের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার জন্য একই দিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে বৈঠকের প্রস্তাব দেন। অভিযোগগুলোর তথ্য-প্রমাণ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সামনে আলোচনা করতেও তিনি প্রস্তুত বলে জানান। ভবিষ্যতে প্রমাণ ছাড়া তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
মাউশির ডিজির নির্দেশে তদন্ত, ৩ সদস্যের কমিটি :
আব্দুল হাকিম নিজেকে মাউশির মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন—এমন অভিযোগসহ প্রকাশিত সংবাদে উত্থাপিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, আলোচিত বিষয়গুলো সম্পর্কে তিনি অবগত এবং এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে এসইসিপ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে স্মারক নং মাউশি/সেসিপ/১-১৬৯/শৃংখলা/২০১৫ (অংশ-১)/৩০৮৯-এর মাধ্যমে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে রয়েছেন—
অধ্যাপক মিনহাজউদ্দীন আহমেদ, সহকারী পরিচালক-৩ (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা—সভাপতি। মো. খায়শেদ আলম, সহকারী পরিচালক-৫ (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা—সদস্য। মো. মিজানুর রহমান, সহকারী পরিচালক-১ (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা—সদস্য সচিব। আদেশে কমিটিকে প্রকাশিত সংবাদে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তদন্তপূর্বক সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
আদেশটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে জারি করা হয়েছে। এতে স্বাক্ষর করেছেন এসইসিপের যুগ্ম প্রোগ্রাম পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর মো. আমিনুল ইসলাম। আদেশের অনুলিপি মাউশির মহাপরিচালক ও এসইসিপের প্রোগ্রাম পরিচালক, পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), পরিচালক (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, ঢাকা অঞ্চল), উপপরিচালক (প্রশাসন), জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, ঢাকা এবং বাড্ডা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছেও পাঠানো হয়েছে।
‘তদন্ত শুরু হয়েছে’—এসইসিপ : এ বিষয়ে এসইসিপ প্রকল্পের যুগ্ম পরিচালক (পিডি অ.দা.) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। মাউশির মহাপরিচালকের নির্দেশনা এবং বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার বক্তব্য, সরকারি বিধিমালা ও সার্ভিস রুল অনুযায়ী শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত বা শাস্তি দেওয়া যায় না। অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার পরই বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যথাযথ আইনি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের তদন্ত কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
অভিযোগের পাহাড়, এখন ‘সাত কর্মদিবসের’ পরীক্ষা :
একদিকে প্রায় এক ডজন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—ঘুষ ছাড়া এমপিও ও অন্যান্য সেবা পাওয়া কঠিন, ফাইল আটকে অর্থ আদায়, নিয়োগে প্রভাব বিস্তার, পছন্দের ব্যক্তিকে ‘শ্রেষ্ঠ’ নির্বাচিত করা, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং অভিযোগকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বাড্ডা থানা শিক্ষা অফিসে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত কর্মকর্তা আব্দুল হাকিমের দাবি—এসব অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত; কয়েকজন অসন্তুষ্ট ও বিতাড়িত শিক্ষক পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন।
এখন প্রশ্ন একটাই—অভিযোগগুলোর পেছনে কি সত্যিই কোনো অনিয়মের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, নাকি এগুলো পরিকল্পিত অপপ্রচার?
তার উত্তর খুঁজতেই তদন্ত কমিটির সামনে রয়েছে এমপিও ফাইলের গতিবিধি, ইএমআইএস তথ্য, নিয়োগসংক্রান্ত নথি, আর্থিক হিসাব ও ভাউচার, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, কথিত কল রেকর্ড, অনুষ্ঠানের ভিডিও এবং সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ। তদন্তে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পথ খুলবে। আর অভিযোগ মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্ট হবে।
তবে ‘আমি মাউশির ডিজির লোক, আমার হাত অনেক লম্বা’—এমন বক্তব্য আদৌ দেওয়া হয়েছিল কি না, এমপিও ফাইল ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বাস্তবতা কতটুকু, নিয়োগ ও ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখন নির্ভর করছে সাত কর্মদিবসের মধ্যে দাখিল করতে বলা সেই তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর।









