কালো তালিকাভুক্ত এনডিইকে কাজ পাইয়ে দিতে তৎপরতা, গণপূর্তের ৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য ২০ তলা কর ভবন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারি এই প্রকল্পের কাজ পেতে কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের (এনডিই) বিরুদ্ধে নানা কৌশল ও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরাসরি দরপত্রে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা না থাকলেও অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের আড়ালে প্রকল্পটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। আর এ কাজে গণপূর্তের পাঁচ কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-৪ গত ১২ মে তিনটি বেজমেন্টসহ ২০ তলা কর ভবন নির্মাণের জন্য প্রথমবার দরপত্র আহ্বান করে। দরপত্রটির আইডি নম্বর ছিল ১৩২২৪১৩। প্রায় ২০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ পেতে এনডিই শুরু থেকেই তৎপরতা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে দরপত্রের নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি কাজ পাওয়ার চেষ্টা করে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের প্রভাবিত করে নিজেদের পক্ষে সুপারিশ আদায়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। একপর্যায়ে এনডিইকে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব মন্ত্রণালয় পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

তবে প্রথম দফার দরপত্র নিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ সামনে আসার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ সামনে আসার পর মন্ত্রণালয় প্রথম দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের নির্দেশ দেয়। এতে প্রথম দফায় কাজ পাওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটির।

এরপর গত ৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো একই প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়। এবার সরাসরি অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতার সংকট থাকায় এনডিই নতুন কৌশল গ্রহণ করে বলে অভিযোগ উঠেছে। খোকন কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের (কেসিইএল) সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের চুক্তি করে কেসিইএল-জেভি নামে দরপত্রে অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এই যৌথ উদ্যোগের আড়ালে মূলত এনডিই নিজেদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে আগেরবারের মতো এবারও প্রকল্পের কাজ নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

অভিযোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এনডিইর সঙ্গে কেসিইএলের যৌথ উদ্যোগের চুক্তিতে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা দরপত্রের যোগ্যতা ও শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মূল চুক্তিপত্র এবং প্রতিষ্ঠান দুটির প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই করলেই পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এনডিইর বিরুদ্ধে প্রথম দফার দরপত্রে অযোগ্যতা ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর দ্বিতীয় দফায় অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।

এদিকে এনডিইর বিরুদ্ধে ডেসকোর একটি কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারার কারণে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, কালো তালিকাভুক্ত কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সরকারি দরপত্রে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। অথচ সেই অবস্থায় থেকেও এনডিই কীভাবে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে কাজ পাওয়ার চেষ্টা করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কালো তালিকাভুক্তির তথ্য গোপন রেখে অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নেওয়া হয়ে থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

শুধু আগ্রাবাদের কর ভবন প্রকল্প নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এনডিইর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বড় অঙ্কের সরকারি কাজ নেওয়ার অভিযোগ ছিল। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সে সময় দলীয় যোগাযোগ ও প্রভাব ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ পেয়েছে। বড় অঙ্কের ব্যাংকঋণ নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও কাজের মান ও নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ডেসকোর কাজে ব্যর্থতার কারণে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার ঘটনাটিও সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও অন্তত পাঁচটি সরকারি দপ্তরের অসাধু প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এনডিই বিভিন্ন কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। এসব ক্ষেত্রে কত টাকা লেনদেন হয়েছে, কারা সহযোগিতা করেছেন এবং কোন কোন প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানটি সুবিধা পেয়েছে, তা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের কর ভবন প্রকল্পে গণপূর্তের পাঁচ কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা যাচাই না করে কীভাবে এনডিই-সংশ্লিষ্ট যৌথ উদ্যোগকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করা হলো, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনডিইর একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোন করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের পক্ষের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম বা বিধিবহির্ভূত কোনো সুপারিশের প্রমাণ মিললে প্রয়োজনে দরপত্র বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে। সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও তিনি জানান।

সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রভাবশালী কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট তৈরি করে সরকারি উন্নয়নকাজ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর ফলে যোগ্য ও সৎ ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রাজনৈতিক যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন এবং কর্মকর্তাদের যোগসাজশের মাধ্যমে দরপত্র প্রক্রিয়া প্রভাবিত করা হলে সরকারের অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি উন্নয়নকাজের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ডেসকোর কারণে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার অভিযোগ থাকা এনডিই কীভাবে নতুন করে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেল? কেসিইএলের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের চুক্তিতে কী কী শর্ত রয়েছে? গণপূর্তের কোন পাঁচ কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছেন এবং তাঁদের সুপারিশের পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেন ছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে যৌথ উদ্যোগের মূল চুক্তি, দরপত্রের নথি, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার কাগজপত্র এবং কালো তালিকাভুক্তির আদেশ যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে শুধু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নয়, এর সঙ্গে জড়িত সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

  • Related Posts

    বন্ড সুবিধার ২,২৩৭ টন কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি, রিয়াজ নিটওয়্যারের বিরুদ্ধে ৯৪ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাপড় আমদানি করে তা দিয়ে পোশাক তৈরি ও বিদেশে রপ্তানি করার কথা। কিন্তু সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাপড় খোলাবাজারে বিক্রির…

    মহামায়া ইকোপার্কে রাজস্ব লুটের অভিযোগ, বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত মহামায়া ইকোপার্কে সরকারি রাজস্ব আদায় নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পার্কটির প্রবেশ ফি, গাড়ি পার্কিং, প্যাডেল বোট এবং লেকে নৌভ্রমণের টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    বন্ড সুবিধার ২,২৩৭ টন কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি, রিয়াজ নিটওয়্যারের বিরুদ্ধে ৯৪ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

    • By admin admon
    • নভেম্বর ৮, ২০২৬
    • 13 views
    বন্ড সুবিধার ২,২৩৭ টন কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি, রিয়াজ নিটওয়্যারের বিরুদ্ধে ৯৪ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

    সংঘাত এড়াতে চরে তরমুজ চাষ বন্ধের পরামর্শ দিলেন প্রতিমন্ত্রী নুর

    • By admin admon
    • নভেম্বর ৮, ২০২৬
    • 14 views
    সংঘাত এড়াতে চরে তরমুজ চাষ বন্ধের পরামর্শ দিলেন প্রতিমন্ত্রী নুর

    সামরিক চাপে দমাতে না পেরে ইরানকে ঘায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল

    • By admin admon
    • নভেম্বর ৮, ২০২৬
    • 13 views
    সামরিক চাপে দমাতে না পেরে ইরানকে ঘায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল

    ইসলামী ঐতিহ্যের ৩২ হাজারের বেশি দুর্লভ বই আছে সৌদির যে লাইব্রেরিতে

    • By admin admon
    • নভেম্বর ৮, ২০২৬
    • 8 views
    ইসলামী ঐতিহ্যের ৩২ হাজারের বেশি দুর্লভ বই আছে সৌদির যে লাইব্রেরিতে

    শাকিবের ‘নিঃস্ব’ ছবিতে বলিউড চমক, শুটিং শুরু কবে

    • By admin admon
    • নভেম্বর ৮, ২০২৬
    • 11 views
    শাকিবের ‘নিঃস্ব’ ছবিতে বলিউড চমক, শুটিং শুরু কবে

    ‘মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ ২০২৬’ মুকুট জিতলেন সামিরা খান মাহি

    • By admin admon
    • নভেম্বর ৮, ২০২৬
    • 8 views
    ‘মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ ২০২৬’ মুকুট জিতলেন সামিরা খান মাহি