নির্বাহী প্রকৌশলীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ভিন্ন একাউন্টে ১৫টি চেক নগদায়ন, বিপুল সরকারি অর্থ আত্মসাৎয়ের অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগে (PWD) সরকারি বিল পরিশোধের নিরাপদ ও নির্ধারিত প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে সংঘটিত হয়েছে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম। অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, হাতিয়া মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদারের বিলের চেকগুলো নির্দিষ্ট ব্যাংক একাউন্টে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অন্তত ১৫টি চেক ভিন্ন একাউন্টের মাধ্যমে নগদায়ন করা হয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনায় পূবালী ব্যাংক দত্তেরহাট শাখা আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে এবং নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সালের ৭ ডিসেম্বর হাতিয়া মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান KE-OG-DESH (JV)-এর সঙ্গে নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের প্রায় ১৪ কোটি ৯২ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কাজ বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার পূবালী ব্যাংক দত্তেরহাট শাখা থেকে ওয়ার্ক অর্ডারের বিপরীতে ঋণ গ্রহণ করে। সরকারি প্রকল্পে এ ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে একটি বাধ্যতামূলক শর্ত হলো—কাজের বিপরীতে ইস্যুকৃত প্রতিটি বিলের চেক সরাসরি ব্যাংকের নির্ধারিত ঋণ একাউন্টে জমা দিতে হবে, যাতে ঠিকাদার অন্য কোনোভাবে অর্থ উত্তোলন করতে না পারেন।

এই শর্ত পূরণে নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগ ২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি লিখিতভাবে ব্যাংককে জানায় যে, হাতিয়া মডেল মসজিদ প্রকল্পের বিপরীতে ইস্যুকৃত সব চেক পূবালী ব্যাংক দত্তেরহাট শাখার অধীন KE-OG-DESH (JV)-এর নির্দিষ্ট একাউন্ট নম্বরের বরাবর ইস্যু করা হবে। এমনকি প্রতিটি চেকের গায়ে ওই একাউন্ট নম্বর, ব্যাংকের নাম ও শাখার নাম উল্লেখ করার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়। এই লিখিত নিশ্চয়তার ভিত্তিতেই ব্যাংক ঠিকাদারের অনুকূলে প্রায় ৭৪ লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি এবং ৩ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে।

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এই নিশ্চয়তার পরও বাস্তবে ঘটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা। ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ পূবালী ব্যাংক দত্তেরহাট শাখা ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তা নবায়নের জন্য গণপূর্ত বিভাগে একটি চিঠি পাঠায় এবং নির্মাণ কাজের অগ্রগতি ও বিল সংক্রান্ত চেকের বিস্তারিত তথ্য জানতে চায়। এই চিঠির পরই সামনে আসে ভয়াবহ আর্থিক অসঙ্গতি।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, তখন পর্যন্ত ইস্যুকৃত ১৩টি চেকের মধ্যে প্রথম সাতটি ও শেষ একটি—মোট আটটি চেক নির্ধারিত ঋণ একাউন্টে জমা দেওয়া হলেও মাঝের পাঁচটি চেক ওই একাউন্টে ইস্যু করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি ধরা পড়ার পর বিভাগীয় হিসাবরক্ষক মো. ইমরান হোসেন ব্যাংকে গিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন, ঘটনা প্রকাশ পেলে তার চাকরি থাকবে না।

তবে এখানেই শেষ নয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এর পরবর্তী সময়ে একই প্রকল্পের বিপরীতে আরও ১০টি চেক ইস্যু করা হলেও একটিও নির্ধারিত ঋণ একাউন্টে জমা দেওয়া হয়নি। ফলে মোট ২৩টি চেকের মধ্যে মাত্র আটটি সঠিক একাউন্টে জমা হয় এবং বাকি ১৫টি চেক ভিন্ন একাউন্টের মাধ্যমে নগদায়ন করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত একাউন্টে জমা হওয়া আটটি চেকের মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। কিন্তু বাকি ১৫টি চেকের অর্থ ভিন্ন পথে চলে যাওয়ায় ঠিকাদারের বিপরীতে পূবালী ব্যাংক দত্তেরহাট শাখার অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই অনিয়মের কারণে ব্যাংকটি আরেকটি বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের মুখে পড়েছে।

এই চেক জালিয়াতির পেছনে গণপূর্ত বিভাগের ভেতরের লোকজনের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে বিভাগীয় হিসাবরক্ষক মো. ইমরান হোসেন ও ক্যাশিয়ারের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ইমরান হোসেন নোয়াখালীর বাসিন্দা হওয়ায় স্থানীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাহী প্রকৌশলীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ২৭ জুলাই ইমরান হোসেন পদোন্নতি পেয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের তদবিরে নিজ জেলা নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগে পদায়ন নিশ্চিত করেন। একই কর্মস্থলে তিনি সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, ক্যাশিয়ারও ২০০৪ সাল থেকে একই বিভাগে কর্মরত থাকায় স্থানীয় ঠিকাদারদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় এড়িয়ে হিসাবরক্ষক ও ক্যাশিয়ারের দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে ঠিকাদারদের ঋণ থাকে এবং চেক প্রস্তুতের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের। তারা চেক সইয়ের জন্য তার কাছে নিয়ে আসে এবং বলে যে একাউন্ট নম্বর রেজিস্টার দেখে চেকের গায়ে লিখে দেওয়া হবে। এরপর যদি তারা চেকের গায়ে নির্ধারিত একাউন্ট নম্বর না লিখে ঠিকাদারের হাতে তুলে দেয়, তাহলে তা তার জানার কথা নয় বলে তিনি দাবি করেন।

  • Related Posts

    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ মাদারীপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র ও কার্যাদেশ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এলজিইডির সাবেক মাদারীপুর জেলা নির্বাহী…

    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার মো. জাহিদ হাসানের বদলিকে কেন্দ্র করে তাঁর দায়িত্ব পালনকালের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় তাঁর বদলি হওয়ার খবরের পাশাপাশি ভিজিটিং কার্ড…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    বিদ্যুৎ বিলের চাপে ৬৯ শতাংশ পরিবার

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 13 views
    বিদ্যুৎ বিলের চাপে ৬৯ শতাংশ পরিবার

    বাংলাদেশ-জাপান ছয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 13 views
    বাংলাদেশ-জাপান ছয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি

    ইরানের ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হদিস মিলছে না: আইএইএ

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 9 views
    ইরানের ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হদিস মিলছে না: আইএইএ

    স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ৬৪

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 14 views
    স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ৬৪

    পাঁচ গ্রামে বাঘের পায়ের ছাপ, ড্রোন উড়িয়ে তল্লাশি, আতঙ্ক

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 14 views
    পাঁচ গ্রামে বাঘের পায়ের ছাপ, ড্রোন উড়িয়ে তল্লাশি, আতঙ্ক

    সিঙ্গাপুরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 9 views
    সিঙ্গাপুরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ